আবাসিক এলাকা যেন মদের স্বর্গরাজ্য: উত্তরায় মদের বার আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে বাসিন্দাদের

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত উত্তরা। বর্তমানে সাধারণ বাসিন্দাদের কাছে এক আতঙ্কের জনপদ। সন্ধ্যা নামলেই এই এলাকার দৃশ্যপট পাল্টে যায়। বিভিন্ন সেক্টরের আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা বৈধ ও অবৈধ মদের বারের প্রভাবে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। একদিকে বারের উচ্চশব্দ, অন্যদিকে মাতালদের বিশৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে এক ভুতুড়ে ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে উত্তরার বাসিন্দাদের।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, তরুণ-তরুণীদের অবাধ মেলামেশার অভয় আশ্রয় হয়ে পড়েছে এই বারগুলো। এখানে মদ্যপানের পর চলে অনৈতিক কার্যক্রম। অর্থের বিনিময়ে আনন্দ-ফুর্তির আড়ালে নারী সরবরাহের মতো অভিযোগও রয়েছে। এছাড়াও উচ্চশব্দে ডিজে গান ও অশ্লীল নৃত্য চলে সারারাত। এতে অতিষ্ট হয়ে পড়েছেন এলাকার বাসীন্দারা।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উত্তরা জুড়ে অন্তত ডজনেরও বেশি মদের বার রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় বা হাসপাতালের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে বারের লাইসেন্স প্রদানের নিয়ম নেই। অথচ উত্তরার অধিকাংশ বারই স্কুল-কলেজ ও মসজিদের গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, টাইগার বার, সিটি বার, ক্যাম্ফায়ার বার, মার্গারিটা বার, কিচেন হাউজ বার, কিংফিশার বার, নেক্সট বার, কম্বো রেস্তোরাঁ ও বার, ঢাকা রয়েল ক্লাব এবং বাংলাদেশ ক্লাবসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, আবাসিক এলাকায় মদের বার বন্ধের দাবিতে গত ২৪ এপ্রিল উত্তরার আলেম-উলামা ও সাধারণ মুসল্লিরা বিক্ষোভ মিছিল ও র‌্যালি করেন। ২৬ এপ্রিল থেকে টানা তিনদিন বারের সামনে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানান এলাকাবাসী। এরই প্রেক্ষিতে উত্তরা জোনের উপকমিশনারের (ডিসি) নেতৃত্বে অভিযানে ১৪৪ জনকে আটক করা হলেও পরিস্থিতির স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী, কেবল আন্তর্জাতিক মানের হোটেল বা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী ক্লাবই বারের লাইসেন্স পেতে পারে। এছাড়া পারমিট ছাড়া অ্যালকোহল সেবন বা সরবরাহ দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু উত্তরার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো প্রকার বৈধ পারমিট ছাড়াই উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের কাছে দেদারসে মদ বিক্রি করা হচ্ছে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় এসব কিশোর-যুবকরা বারের সামনে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে, যা এলাকায় ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বাড়িয়ে দিয়েছে।

আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে টাইগার বারের ম্যানেজার লুৎফর রহমান বলেন, “আমরা সবকিছু ম্যানেজ করেই ব্যবসা করি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে।” তবে তার এই বক্তব্যে প্রশাসনের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মানুষের মনে।

বিষয়টি নিয়ে কিংফিশার বার এর মালিক জুয়েলকে বার বার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি।

এ বিষয়ে উত্তরা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তারেক আহমেদ বেগ বলেন, “মদের বারের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। জননিরাপত্তা রক্ষায় আমাদের এই অভিযান চলমান থাকবে।”

একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গঠনের জন্য আবাসিক এলাকা থেকে মদের বারের মতো প্রতিষ্ঠান দ্রুত সরিয়ে নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের আরও কঠোর ও আপসহীন ভূমিকা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় উত্তরার মতো পরিকল্পিত আবাসন এলাকা অচিরেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button