শিশুদের চরিত্র গঠনে ইসলামি শিক্ষা

✍মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকী:

শিশুদের চরিত্র গঠন একটি নেহায়েত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিশু বাবা-মা’র কাছে একটি আমানত। শিশুর অন্তর একটি উৎকৃষ্ট মুক্তা, সরল, অকৃত্রিম, সকল চিত্র থেকে মুক্ত এবং সব ধরনের চিত্র গ্রহণের জন্য শিশুর মন উন্মুক্ত থাকে। এই মনকে যেদিকে ঝুঁকানো যায়, যেমন- যদি তাকে উত্তম শিক্ষা দেয়া হয় এবং সততায় অভ্যস্ত করা হয়, তাহলে বড় হয়েও তাই করবে এবং দুনিয়া আখিরাতের সৌভাগ্য অর্জন করবে। এই সওয়াবে বাবা-মা আদব শিক্ষাদাতা সকলেই অংশীদার হবে। কিন্তু যদি শিশুকে কুশিক্ষায় অভ্যস্ত করা হয় এবং পশুর মত বল্লাহীন ছেড়ে দেয়া হয়, তবে শিশু নিশ্চিতই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং এর দায়-দায়িত্ব শিশুর মুরব্বির উপর বর্তাবে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا –

“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর।”

কারো বাবা যখন দুনিয়ার আগুন থেকে তার সন্তানদেরকে রক্ষা করে, তখন আখিরাতের আগুন থেকে রক্ষা করা আরও বেশী জরুরী হয়ে পড়ে। আখিরাতের আগুন থেকে রক্ষা করার উপায় হচ্ছে সন্তানকে আদব-কায়দা, ভদ্রতা ও সচ্চরিত্রতা শিক্ষা দেয়া, অসৎ সঙ্গ থেকে দূরে রাখা এবং সাজসজ্জা, বিলাসিতা ও আরামপ্রিয়তাকে তার দষ্টিতে হেয় করা, যাতে বড় হয়ে এগুলোর অন্বেষণ না করে। প্রথম থেকেই শিশুর রক্ষণাবেক্ষণ করা জরুরী। সেমতে তাকে কোন নেককার, ধর্মপরায়ণা ও হালালখোর নারীর দুধ পান করাবে। কারণ, হারামের দুধে বরকত হয় না। শৈশবে হারামের দুধ পান করলে তা বিবেকের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। ফলে বড় হয়ে সে খারাপ চরিত্রের দিকে সহজে আকৃষ্ট হয়ে যায়।

শিশুর মধ্যে যখন কিছু সদ্বিবেচনা শুরু হয়, তখন তার অধিক দেখাশুনা করা প্রয়োজন। হায়া-শরমের বিকাশে সম্বিবেচনার জন্ম হয়। ফলে শিশু কিছু কাজ-কর্ম লজ্জাবশত ছেড়ে দেয়। এটা এ কারণে হয় যে, তখন তার মধ্যে জান-বুদ্ধিরূপী নূরের ঝলক এসে যায় এবং সে কিছু বিষয়কে কতক বিষয়ের তুলনায় খারাপ মনে করে। ফলে অসৎ কর্ম করতে লজ্জাবোধ করে। আল্লাহ তা’আলার এ দানটি চরিত্রের সমতা ও অন্তরের পরিচ্ছন্নতা জ্ঞাপন করে। এতে বুঝা যায়, বড় হয়ে সে পূর্ণ বিবেকবান হবে। এমন লজ্জাশীল শিশুকে অযত্নে ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। বরং লজ্জা ও শিষ্টাচার আয়ত্তের কাজে তাকে সাহায্য করা দরকার।

প্রথমেই শিশুর মধ্যে যে স্বভাব দেখা দেয়, তা হচ্ছে খাওয়ার প্রতি আসক্তি। কাজেই এরই আদব তাকে শেখানো উচিত। অর্থাৎ সে ডান হাতে খাবে। খাওয়ার পূর্বে বিসমিল্লাহ বলবে। সম্মুখভাগ থেকে খাবে। অন্যের আগে খাওয়া আরম্ভ করবে না। খাবারের প্রতি চোখ তুলে তাকাবে না। তাড়াহুড়ো করে খাবে না। ভালোভাবে চিবিয়ে খাবে। একের পর এক মুখে লোকমা তুলে দেবে না। মাঝে মধ্যে তার তরকারি ছাড়া শুধু রুটি খাওয়ার অভ্যাস করবে, যাতে সে বুঝে, তরকারি দিয়ে রুটি খাওয়া দরকার নাই।

শিশুর সামনে অধিক ভোজনের নিন্দা করা উচিত। যারা অল্প ভোজন করে তার সামনে তাদের প্রশংসা করবে। অন্যকে খাবার দেয়া যে ভাল, এ বিষয়টিও তার সামনে জাগিয়ে তুলবে। পোশাকের মধ্যে সাদা পোশাক শিশুকে পছন্দ করানো উচিত। রঙীন ও রেশমী পোশাক সম্বন্ধে বলে দেবে, এগুলো নারীদের পোশাক। পুরুষেরা এগুলোকে পছন্দ করে না।

এরপর শিশুকে মক্তবে পাঠিয়ে কুরআন হাদীস ও সৎকর্মপরায়ণদের গল্প শেখানো উচিত, যাতে তার মনে সৎকর্মপরায়ণদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। শিশুকে ইশক ও প্রেমের কবিতা পাঠ করতে দেবে না। কেননা, এতে অন্তরে অনর্থের বীজ বপন করা হয়। শিশু কোন ভাল কাজ করলে তাকে পুরস্কৃত করবে। প্রশংসা করবে। এতে সে খুশি হবে। এক, দু’বার ব্যতিক্রম কাজ করলে চোখ ফিরিয়ে নেবে, পর্দা উন্মোচন করবে না। বিশেষ করে এমন কাজে যা শিশু নিজেই লুকাতে চায়। কেননা, সে যদি জেনে যায় যে, এ কাজটি প্রকাশ হয়ে পড়ায় কিছু হয়নি, তবে ভবিষ্যতে আরও বেপরোয়া হয়ে যাবে। পুনরায় এ খারাপ কাজটি করলে তাকে গোপনে শাসাবে। শিশুকে সব সময় শাসানো উচিত নয়। এতে সে তিরস্কারে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং মন্দ কাজ করার সাহস বেড়ে যায়। বাবার সাথে সাথে মা’ও শিশুকে খারাপ কাজে বাধা দেবে এবং পিতার ভয় দেখাবে।

শিশুকে নরম বিছানা দেবে না, এতে তার দেহ শক্ত হয় এবং সে আরামপ্রিয় হয় না। এভাবে পোশাক ও খাদ্যের ব্যাপারেও শিশুকে আরামপ্রিয় হতে দেয়া উচিত নয়।

মক্তব থেকে ফিরে আসার পর শিশুকে কোন ভাল খেলার অনুমতি দেয়া উচিত, যাতে মক্তবের পরিশ্রম লাঘব হয়। কিন্তু এত অধিক খেলবে না যাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এতটুকু খেলার অনুমতি না দিলে এবং শিক্ষায় সব সময় কঠোর হলে শিশুর মন মরে যায়, জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। ফলে সে শিক্ষা থেকে মুক্তি পাওয়ার বাহানা খুঁজতে থাকে।

★পরিশেষে বলবো…
শিশু সুবিচনার বয়সে পৌঁছলে তাকে ওযু ও নামায শিক্ষা দেবে। রমযান মাসে কিছু কিছু রোযা রাখাবে।
আল্লাহ তাআলা যেন সকল শিশুদের নেক হায়াত দান করেন আমিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button