

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশে ক্রমেই বাড়ছে বাতের কষ্টে ভোগা মানুষের সংখ্যা। শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত ওষুধ সেবনের পাশাপাশি নিয়ম মেনে জীবন পরিচালনা করা গেলে বাতের যন্ত্রণা থেকে অনেকটা স্বস্তি পেতে পারেন রোগীরা। তবে সঠিক সময় উপযুক্ত চিকিৎসা না করা গেলে ঝুঁকিতে পড়বে রোগীর জীবন।
২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা ১১ কোটি। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ভুগছেন। তথ্য অনুযায়ী হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে বেশি ভুগছেন নারীরা।
শনিবার (১১ মে) রাজধানীর বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব কনভেনশন সেন্টারে বাত ব্যথা রোগীদের সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে চিকিৎসকরা এসব কথা বলেন। বাত ব্যথা রোগীদের জন্য কাজ করা সংগঠন প্রফেসর নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ (পিএনআরএফআর) ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বাত ব্যথা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী মাজা ব্যথা বাত, গিরাব্যথা, হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস, স্পন্ডাইলো আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয় রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেশি।
চিকিৎসকরা বলছেন, বাতের রোগীদের ওপর গবেষণা বাড়ানো গেলে আরও সুনির্দিষ্ট করে এ বিষয়ে তথ্য উপাত্ত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও দেশে বাত ব্যথা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংকট দিন দিন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বাত ব্যথা সংক্রান্ত তথ্য উপাত্ত নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিএনআরএফআর ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ও শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নীরা ফেরদৌস।
মূল প্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে দেশভেদে ২৫-৫০% মানুষ বিভিন্ন গিরা/পেশীর ব্যথায় ভুগছেন। নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি ভুগে থাকেন। গিরা ব্যথার কারণে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কাজ করতে অক্ষম হয়ে যায়।
পাশাপাশি শারীরিক স্থুলতা ও হাঁটুতে আগে আঘাত পাওয়া ব্যক্তিদের এ রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অন্যদিকে কোমর ব্যথা বাতের (লাম্বার স্পনডাইলাইটিস) প্রকোপও অনেক বেশি। বাত নিয়ে দেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ বা ২ কোটি ৫ লাখ বেশি এ সমস্যায় ভুগছেন।
যৌবন বয়সের বাত রোগীদের স্পন্ডাইলো আর্থ্রাইটিসে (SPA) আক্রান্তের হারও উদ্বেগজনক বলে প্রবন্ধে জানানো হয়। গবেষণার প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেশের ১ দশমিক ২ শতাংশ বা সাড়ে ১৩ লাখ মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন।
এর বাইরে যে কোনো ধরণের ব্যথায় ভোগা মানুষ নিজেকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে গাউট রোগের চিকিৎসা নেন। যেখানে ইউরিক এসিডহ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন। তবে তথ্য বলছে, গাউট সমস্যায় ভুগছেন দেশের মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বা সাড়ে ৫ লাখ মানুষ।
তবে ইউরিক এসিডের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে ৩৩ শতাংশ বা সাড়ে ৩ কোটি মানুষের। তবে তারা গাউটের রোগী নন। কিন্তু গাউটের ওষুধ সেবন করেন। যা একটা সময় শারীরিক অন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে। দেশের প্রায় ১১ লাখ মানুষ সোরিয়েটিক আর্থ্রাইটিস রোগে ভুগছেন বলেও জানানো হয় অনুষ্ঠানে।
এদিকে এশিয়ায় প্রতি লাখে ৩০ থেকে ৫০ জন মানুষ এসএলই বা লুপাস রোগে ভুগতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পাশ্ববর্তী দেশের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে প্রতি লাখে ১৪-৬০ জন মানুষ লুপাস সমস্যায় ভুগতেন। তবে আশার খবর ধীরে ধীরে এই রোগের ভালো চিকিৎসা দেশের রিউমাটোলজিস্টরা সফলভাবে রোগীদের সুস্থ্যভাবে থাকতে সাহায্য করছেন।
পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রায় ২০% মানুষ অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয় রোগে ভুগছেন। ২০২২ সালের গণশুমারি অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ৫০ ঊর্ধ্ব বয়সী মানুষ প্রায় ৩ কোটি। সেই হিসেবে দেশের প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এই রোগে ভুগছেন। তবে উদ্বেগের বিষয় এই হাড়ক্ষয় রোগে মেরুদন্ডের হাড় ভাঙ্গার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি এবং এই রোগের কারণে মৃত্যু ঝুঁকি প্রায় ৮ গুন বেড়ে যায়। অবশ্য আশার কথা ওষুধ সেবন করে ৬-১২ মাস চিকিৎসা করলে এই রোগ থেকে হাড় ভাঙ্গার ঝুঁকি প্রায় অর্ধেকে (৫০%) কমে আসে।
অনুষ্ঠানে পিএনআরএফআরের পক্ষ থেকে ২১ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিএনআরএফআরের চেয়ারম্যান, এশিয়া প্যাসিফিক লীগ অফ অ্যাসোসিয়েশন ফর রিউমাটোলজি ভাইস প্রসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মূখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি বিষয়ক) মো. আখতার হোসেন, পথিকৃত ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলি, সাবেক সংসদ সদস্য ও বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা শিরীন আহমেদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, অধ্যাপক ডা. সুজন আল হাসান, পিএনআরএফারের সেক্রেটারি জেনারেল ড. পিযুষ কান্তি বিশ্বাস প্রমুখ।




