সত্যে অবিচল দৈনিক প্রথমবেলা

টঙ্গীস্থ শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে  দালাল চক্র লুটে নেয় রোগীদের অর্থ

21

হাসপাতালকে ঘিরে দালালদের বিশাল সিন্ডিকেট : রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার

 

মনির হোসেন জীবন: রাজধানীর অতিসন্নিকটে গাজীপুরের  টঙ্গী শিল্পনগরী স্টেশন রোড এলাকায় গড়ে উঠেছে   ২৫০   শয্যা   বিশিষ্ট  শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল। বর্তমানে দালাল চক্রের হাতে জিম্বি হয়ে পড়েছে এ হাসপাতালটি। দালাল চক্রের সদস্যরা একাধিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ও পরস্পর যোগসাজসে লুটে নেয় সাধারণ রোগীদের অর্থ। তারা কখনও কখনও সুযোগ বুঝে সাধারণ রোগীদের নিকট থেকে নগদ  টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র  কৌশলে   হাতিয়ে   নিয়ে  ছিটকে পড়ে।   এখানে কোন ধরনের নিয়মনীতি নেই বললেই চলে। অনিয়ম এখানে নিয়মে  পরিণত   হয়েছে।   যার   ফলে   রোগীরা   চরম ভোগান্তির শিকার হচেছন।  এলাকাবাসিও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এধরনের অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে বিকেল পর্যন্ত   এখানে   বসে   বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানীর রিপ্রেজেনট্রেটিভদের  হাঁট। রোগী দেখার সময় হাসপাতালের ডাক্তাররা চিকিৎসাসেবা ফেলে রেখে রিপ্রেজেনট্রেটিভদের সাথে প্রায়ই খোশগল্পে   মেতে   থাকে।  পাশাপাশি   বিভিন্ন   ওষুধ কোম্পানীর নিন্মমানের   ওষুধ   বেশি  কমিশন পাওয়ার আশায় প্রেসক্রিপশন লেখা নিয়ে ডাক্তাররা বেশি ব্যস্ত থাকেন।   উক্ত হাসপাতালের সামনে ব্যাঙ্গের ছাতার মতো গড়ে উঠা বিভিন্ন   ওষুধের   দোকানে   ওঁৎ   পেতে   বসে থাকে   রিপ্রেজেনট্রেটিভদের   লোকজন।  তার মধ্যে অনেককেই হাসপাতালের ডাক্তারের রুমের সামনে, ভেতরে বাহিরে ও বারান্নায় অহেতুক ভাবে ঘুরাফেরা করতে দেখা যায়। হাসপাতালের ডাক্তাররা ঠিকমত ওষুধের প্রেসক্রিপশনে লিখছে কিনা সেটি   দেখার   জন্য।   হাসপাতালে আগমনরত চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা  বর্হিবিভাগের ডাক্তার দেখানোর সাথে সাথেই ডাক্তারের হাত থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে নেয় দালাল চক্রের সদস্যরা। প্রথমে তারা মোবাইল দিয়ে ছবি তোলে নেয়। এসময় রোগীদের সাথে থাকা   আত্নীয়   স্বজন   কোন   কিছু   বুঝে   উঠার আগেই দালাল চক্রের সদস্যরা সেই প্রেসক্রিপশনটি কৌশলে   নিয়ে   চলে   যায়   নির্দিষ্ট   ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে।   আর  এক্ষেত্রে  উক্ত   টাকার   ভাগীদার   থাকে   তিনজন। দালাল-ডাক্তার   আর   ডায়াগনষ্টিক   সেন্টারের   মালিক। খবর একাধিক বিশ্বস্থ তথ্য সুত্রের।

হাসপাতালের ভর্তি রোগী ও রোগীর আত্নীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে,টঙ্গী সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা বুঝতে পারে না যেকোন ওষুধ গুলো আছে আর কোন ওষুধ গুলো নেই। সেই সুযোগ   পেয়ে   ডাক্তাররা   হাসপাতালের   ষ্টোরে   থাকা ওষুধের   নাম   প্রেসক্রিপশনে   লেখেনা।   অধিকাংশ রোগীরা বাহির থেকে ওষুধ কিনে খেতে বাধ্য হয়। তবে, কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারী হাসপাতালের ডাক্তাররা কমদামি কিছু কিছু ওষুধ রোগীদেরকে দিয়ে থাকে। সেকারণে   জনমনে   প্রশ্ন   জাগে   টঙ্গী   সরকারী হাসপাতালের ওষুধ গুলো যায় কোথায় ? টঙ্গীস্থ ২৫০ শয্যা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনালের   হাসপাতালের   জরুরী   বিভাগে   চলছে   ব্যাপক অনিয়ম   ও   সীমাহীন   দুর্নীতি।   হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর আত্নীয় স্বজনরা  বিভিন্ন সময় অহেতুক হয়রানীর শিকার হচেছ। হাসপাতালের দালালদের   খপ্পরে   পড়ে   জরুরী   বিভাগে   যে   বেশি   টাকা দিতে পারে তাদেরকেই আগে ভাল চিকিৎসা করা হয়। আর   দরিদ্র   রোগীদের   কোন   রকম   চিকিৎসা   দিয়ে ছেড়ে   দেয়া   হয়।   সরকার   থেকে   জরুরী   বিভাগের   জন্য প্রয়োজনীয়   ওষুধ, ব্যান্ডেজ, সুতা   ইত্যাদি   প্রদান করে   থাকে।   কিন্তু   রোগীদের   কাছ   থেকে   অনেক   সময় ব্যান্ডেজ,বিভিন্ন ধরনের ইনজেকশন ও  সেলাই   বাবদ   উৎকোচ   নেয়া   হয়ে   থাকে। জরুরী বিভাগের চিকিৎসকরা রোগীদের কাছ থেকে ৫ টাকা থেকে   শুরু করে ২শ  টাকা   পর্যন্ত নিয়ে থাকে। কোন কোন ক্ষেএে আরো বেশি টাকা নিয়ে থাকে। প্রতিদিন শতশত রোগী কোন না কোন ভাবেই হয়রানীর শিকার হচেছ।

এদিকে, টঙ্গী হাসপাতালে   চিকিৎসা   নিতে   আসা   একাধিকরোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে   দৈনিক প্রথম ভেরাকে জানান, অসংখ্যরোগী   প্রতিদিন   বাহির   থেকে   সূতা,   ব্যান্ডেজ, ইনজেকশন   ও   সিরিজ   কিনে   নিয়ে   আসেন। হাসপাতালে   পরীক্ষার   জন্য   এক্র্ররে ও ইসিজি   মেশিন থাকলে ও রোগীদের বাহিরে থেকে ডিজিটাল মেশিনে উন্নত পরীক্ষা করতে অনেক সময় বাধ্য করা হয়। আর জেনারেল   হাসপাতালে   পুরুষ, মহিলা   ও   শিশু   ওয়ার্ডে পয়:নিস্কাশন ব্যবস্থা খুবই নাজুক। টয়লেট অপরিস্কার ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থা নিত্যদিনের  চিএ।  নাম প্রকাশে অনিচছুক ( ছদ্মনাম) লায়লা, ঊষা ও সুমি নামে একাধিক রোগী এবং   তাদের   আত্নীয়রা   খাবারের   মান   ভাল   নয়   বলে অভিযোগ করেন। রোগীদেরকে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার অনেক সময় পরিবেশন করা হয়না। বেশিভাগ সময়ই হাসপাতাল থেকে রোগীদেরকে পঁচাবাসি খাবার সহ প্রয়োজনের চেয়ে কম খাবার দেয়া হয় বলে একাধিক রোগী   অভিযোগ   করেন।   এছাড়া, টঙ্গী   সরকারী হাসপাতালের   সামনে   ৫০/৬০   গজের   ভেতরে   ৪/৫টি বেসরকারী হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। তার মধ্যে রয়েছে সেবা   জেনারেল   হাসপাতাল,   আবেদা   হাসপাতাল, ঢাকা   কিং   হাসপাতাল,   সন্ধ্যানী   হাসপাতাল ইত্যাদি। অনেক সময় উক্ত হাসপাতালের দালাল চক্রের সদস্যরা রোগী বাগিয়ে টঙ্গী থেকে উত্তরার বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে আসেন। বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা কৌশলে হাতিয়ে নিয়ে যাচেছ বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গতকাল বুধবার সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টঙ্গী সরকারী  জেনারেল হাসপাতালের   বারান্দায়   প্রতিদিন   সকাল থেকে রাত ৮/৯ টা পর্যন্ত ১০/১৫জন পুরুষ ও মহিলা দালাল সারাক্ষন ঘুরঘুর করতে থাকে শিকারের আশায়। দালাল চক্রের সদস্যরা মূল গেইটে এবং বারান্দা দিয়ে পায়তারা   করে   বেড়ায়।   এছাড়া   হাসপাতালের   ভেতরে কতিপয়   সার্স   এবং   আয়ারা   মহিলা   গর্ভবর্তী রোগীদের   হাসপাতাল   থেকে   ফুসলিয়ে   নিয়ে   বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে   (এমআর   )   করে   থাকে।   বিনিময়ে   তারা রোগীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে থাকে বলেও অভিযেোগ উঠেছে।

এছাড়া   ও   বর্হিবিভাগের   সামনে   রিকসা,   ভ্যান, অটোরিকসা   ,   মোটরসাইকেল,   অটোরিকসা, সিএনজি   ও   টেম্পু   পার্কিং   নিষিদ্ধ   থাকলেও   তা কোন বাস্তবায়ন   নেই।   রাতের   বেলায়   টঙ্গী   সরকারী হাসপাতালটি   চলে   যায়   মাদক   ব্যবসায়ী, সেবী,নেশাখোর, পকেটমার,  ছিনতাইকারী আর অপরাধীদের   দখলে।  ইতোপূর্বে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ মদ বিয়ার,গাঁজা,ফেন্সিডিলসহ একাধিক মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারী সদস্যকে আটক করেছে। তার মধ্যে অনেকে গাজীপুর জেলখানায় আটকা আছে। আবার অনেকেই জামিনে বের হয়ে পূনরায় মাদক ব্যবসা সহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড অবাধে চালিয়ে যাচেছন। সেই সাথে হাসপাতালের ভেতরে, গেটে বহিরাগত ও বখাটেদের নিয়মিত আড্ডা দিতে দেখা গেছে। যার ফলে সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অসংখ্য  রোগী   প্রতিদিন   চরম   ভাবে হয়রানী আর ভোগান্তির শিকার হচেছন।

এ   ব্যাপারে   জানতে   হাসপাতালের   আবাসিক মেডিক্যাল   অফিসার   (আরএমও)   ডা:   পারভেজ   রহমান দৈনিক প্রথম বেলাকে জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে, আমরা এধরনের লিখিত কোন অভিযোগ পেয়ে অবশ্যই তার বিরুদ্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.