নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও পানি নিষ্কাশন সংকট নিরসনে বামনী নদীতে নির্মাণাধীন ক্লোজার বাঁধের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাস্তবায়নাধীন ‘নোয়াখালী জেলার বামনী নদী অববাহিকার বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এ অবকাঠামো সম্পন্ন হলে দুই উপজেলার প্রায় ৯ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।
গতকাল বুধবার (১০ জুন) দুপুরে সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে নির্মাণকাজের এই দৃশ্যমান অগ্রগতি জানা গেছে। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান হতে চলায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নোয়াখালীর এই উপকূলীয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও জোয়ার-ভাটার প্রভাবে প্রায়ই বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এর আগে বামনী নদীতে ১৯-ভেন্টের একটি রেগুলেটর নির্মাণ করা হলেও ক্লোজার বাঁধ না থাকায় আলগীর খাল ও নোয়াখালী খালে জোয়ার-ভাটার প্রভাব অব্যাহত ছিল। ফলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, কৃষিজমির ক্ষতি এবং ঘরবাড়ি প্লাবনের মতো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এসব সমস্যা সমাধানে আগে অস্থায়ী মাটির আড়বাঁধ নির্মাণ করা হলেও তা কার্যকর স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। পরবর্তীতে সরকার এই স্থায়ী ক্লোজার বাঁধ প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৪১৫ মিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার গভীর এই ক্লোজার বাঁধ নির্মিত হলে কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলার প্রায় ১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকার ৯ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে প্রায় ২৮০ কোটি টাকার সম্পদ সুরক্ষার আওতায় আসবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা হ্রাসের পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এটি।
গত ১০ মার্চ পানিসম্পদ মন্ত্রী শহিদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু যৌথভাবে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (পিডিএল) ও পাউবো যৌথভাবে দিন-রাত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিকূল আবহাওয়া, ভারী বর্ষণ ও তীব্র জোয়ার-ভাটার মধ্যেও আরএফএল জিও টেক্সটাইলের প্রয়োজনীয় জিও টিউব ও জিওব্যাগ সরবরাহের মাধ্যমে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের ছেলে জুবায়ের ইসলাম ফারুক বলেন:
"বামনী নদীর ক্লোজার বাঁধ এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের একটি প্রকল্প। এটি বাস্তবায়িত হলে শুধু বন্যা, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণই হবে না, বরং এ এলাকাকে ঘিরে পর্যটনেরও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।"
প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, "তীব্র জোয়ার-ভাটা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মাত্র তিন মাসে ক্লোজার বাঁধের মূল নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।"
নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রেফাত জামিল বলেন, "সাধারণত এ ধরনের কাজ পানির স্তর সর্বনিম্ন থাকাকালে ফেব্রুয়ারি মাসে বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা বিবেচনায় নিয়ে আমরা মে-জুন মাসের এই প্রতিকূল সময়েই চ্যালেঞ্জিং কাজটি হাতে নিয়েছি এবং দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছি।"
পানি উন্নয়ন বোর্ড (ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী) অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলেন, প্রকল্পটি নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। এটি সম্পন্ন হলে কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।