পরিকল্পনার ঘাটতি ও বাস্তব অবস্থা যাচাই না করায় যশোরের মণিরামপুরে দুটি খাল পুনঃখননের বরাদ্দ থেকে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৫৮ টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে।

জেলা প্রতিনিধি

যশোর, ৮ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৪

পরিকল্পনার ঘাটতি ও মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা যাচাই না করেই প্রকল্প নেওয়ার অভিযোগে যশোরের মণিরামপুরে দুটি খাল পুনঃখননের কাজ ব্যাহত হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী খনন করতে না পারায় প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৫৮ টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে। গত ২২ জুলাই চালানের মাধ্যমে ওই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।

ফেরত দেওয়া অর্থের মধ্যে মশ্মিমনগর খালের বরাদ্দ থেকে ৮ লাখ ৭৭ হাজার ১ টাকা এবং মোবারকপুর খালের বরাদ্দ থেকে ৫ লাখ ৯১ হাজার ২৮৭ টাকা রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প নেওয়ার আগে পুনঃখননের উপযোগী খালের তালিকা চাওয়া হলেও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) দপ্তর এমন দুটি খাল নির্বাচন করেছে, যেগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি আগে যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। একটিতে দুই পাড়ের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির কারণে নির্ধারিত পরিমাণ মাটি তোলা সম্ভব হয়নি। অন্যটিতে কালভার্ট ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির কারণে নকশা অনুযায়ী খনন করা যায়নি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) অধীনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মণিরামপুরের দুটি খাল পুনঃখননের জন্য ৩৯ লাখ ২৫ হাজার ৫০২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে মশ্মিমনগর খালের ৯৫০ মিটার খননের জন্য ২৫ লাখ ৬৮ হাজার ৭৭৮ টাকা এবং মোবারকপুর খালের ৫০০ মিটার খননের জন্য ১২ লাখ ৯১ হাজার ৭২৪ টাকা বরাদ্দ ছিল। প্রকল্পের তদারকি ও সংশ্লিষ্ট কমিটির ব্যয়ের জন্য আরও ৬৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বরাদ্দ পাওয়ার পর মে মাসে মশ্মিমনগর খালের জন্য ৫৯ জন এবং মোবারকপুর খালের জন্য ৩০ জন শ্রমিকের তালিকা করা হয়। মশ্মিমনগর খাল থেকে ১১ হাজার ৩৬২ দশমিক ৮৩ ঘনফুট এবং মোবারকপুর খাল থেকে ৫ হাজার ১৪৯ দশমিক ২ ঘনফুট মাটি কাটার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কাজ শেষে দেখা যায়, মশ্মিমনগর খাল থেকে ৫ হাজার ১৭০ দশমিক ৯৫ ঘনফুট এবং মোবারকপুর খাল থেকে ১ হাজার ৬৯২ দশমিক ৮৫ ঘনফুট মাটি কাটা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ দুই খালেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম মাটি কাটা হয়েছে।

উপসহকারী প্রকৌশলী সরোয়ার হোসেন বলেন, মশ্মিমনগর খালটি অনেক সরু। কোথাও এর প্রস্থ ১৫ ফুট, কোথাও ২০ ফুট। দুই পাড়েই ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থাকায় নকশা অনুযায়ী মাটি তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকের বেশি মাটি কাটা যায়নি।

অন্যদিকে মোবারকপুর খালের ওপর স্থানীয়দের অর্থায়নে নির্মিত পাঁচ থেকে ছয়টি কালভার্ট রয়েছে। কালভার্টের গোড়া থেকে মাটি তুললে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় স্থানীয়রা শুরু থেকেই খননকাজে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। এ ছাড়া খালের শেষ অংশেও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থাকায় বাধার মুখে পড়ে প্রকল্পটি। ৫০০ মিটারের মধ্যে ৪০৭ মিটার খনন করা গেলেও বাকি ৯৩ মিটার খনন করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, খাল দুটি পুনঃখননের প্রয়োজন থাকলেও প্রকল্প গ্রহণের আগে মাঠপর্যায়ে যথাযথ যাচাই করা হলে কাজটি আরও কার্যকরভাবে করা যেত। বিশেষ করে খালের প্রস্থ, দুই পাড়ের জমির মালিকানা, বিদ্যমান কালভার্ট ও খননের বাস্তব সম্ভাব্যতা আগে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল।

মণিরামপুরের পূর্বাঞ্চল ভবদহ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর বর্ষা ও ভারি বৃষ্টিতে এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বর্তমানে কুলটিয়া ও হরিদাসকাটি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম পানিতে ডুবে আছে। স্থানীয়দের মতে, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় খাল পুনর্খননের প্রকল্প নেওয়া হলে একদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে তা বেশি কার্যকর হতো, অন্যদিকে বরাদ্দের অর্থও ফেরত দিতে হতো না।

তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সেলিম খান এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে খালের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। মণিরামপুরের অধিকাংশ খাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে এবং সেগুলোতে খননকাজ চলমান রয়েছে। নতুন সরকার খাল খননের উদ্যোগ নেওয়ার পর দীর্ঘদিন খনন না হওয়া মশ্মিমনগর ও মোবারকপুর খালকে এ প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী খাল দুটি খনন করা সম্ভব না হওয়ায় মোট বরাদ্দ থেকে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৫৮ টাকা চালানের মাধ্যমে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় খননকাজের পর মশ্মিমনগর খালের দুই পাড়ে ৯০টি এবং মোবারকপুর খালের দুই পাড়ে ৫০টি বিভিন্ন জাতের চারা গাছ রোপণ করা হয়েছে বলেও জানান পিআইও।

মশ্মিমনগর খনন কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য সনদ দত্ত বলেন, মশ্মিমনগর ইউনিয়নের কয়েকটি বিলের পানি এ খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ঝাঁপার বাঁওড়ে পড়ে। খাল পুনঃখননের আগে বর্ষার পানি ৭-৮ দিন পর্যন্ত জমে থাকত। খননের পর পানির প্রবাহ বেড়েছে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশন হচ্ছে।

এদিকে খাল নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।