বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে ‘কুনমিং-চট্টগ্রাম সরাসরি সড়ক যোগাযোগ’ স্থাপন এবং তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন, অবকাঠামো ও কৃষি খাতের সার্বিক উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা বৃদ্ধির তাগিদ দিয়েছেন।

চীনের ইউনান প্রদেশের গভর্নরের বিশেষ আমন্ত্রণে কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘৭ম চায়না-সাউথ এশিয়া কোঅপারেশন ফোরাম’ এবং ‘১০ম চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোজিশন’-এ অংশগ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে এই জোরালো আহ্বান জানান।

শুক্রবার (১২ জুন) সফরসূচির অংশ হিসেবে ডেপুটি স্পিকার চীনের বিখ্যাত কুনমিং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় হাসপাতালের কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনকালে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, "বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে আরও যৌথ ও ব্যাপক কাজ করার বড় সুযোগ রয়েছে। কুনমিংয়ের বিভিন্ন মেডিকেল ও হাসপাতালে বাংলাদেশের রোগীদের জন্য আবাসন, ভাষা, চিকিৎসা খরচ হ্রাস ও ভিসাসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়াগুলো সহজ করা হলে, উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের মানুষ কুনমিংকে অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে বেছে নেবে।" একই সঙ্গে তিনি কুনমিংয়ের হাসপাতালসমূহে বাংলাদেশের অভিজ্ঞ ডাক্তার, টেকনিশিয়ান ও নার্সদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিরও আহ্বান জানান।

হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল হি তাও, মি. ওয়াং জিয়াংকুন এবং কুনমিং মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট প্রফেসর মি. শিয়া সুয়েশানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ডেপুটি স্পিকারের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। তারা আশ্বস্ত করে বলেন, চীন-বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে চলমান স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম দিন দিন আরও বেগবান করা হবে। পাশাপাশি কুনমিং মেডিকেলে অধ্যয়নরত এবং পড়তে ইচ্ছুক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা ও আবাসনসহ সম্ভাব্য সব বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন তারা।

এরপর ডেপুটি স্পিকারের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সংসদীয় ও বাণিজ্য প্রতিনিধিদল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ইউনান প্রদেশের সেক্রেটারি ওয়াং নিংয়ের সঙ্গে হাইজেং গার্ডেন হোটেলে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।

বৈঠকে কায়সার কামাল জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারির অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় দেড় যুগ পর বাংলাদেশ পূর্ণ গণতন্ত্রের ধারায় ফিরে এসেছে। তিনি বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও জনগণের পক্ষ থেকে সিপিসি সেক্রেটারিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান এবং একটি বড় সুসংবাদ দিয়ে বলেন—আগামী জুনের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর দ্বিতীয় বিদেশ সফর হিসেবে চীন সফর করবেন। ডেপুটি স্পিকার সিপিসির এই শীর্ষ নেতাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন।

উক্ত দ্বিপাক্ষিক মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোকতাদির চীনের কাছে বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ অবকাঠামো, পর্যটন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এবং বাংলাদেশের উদীয়মান চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ সেক্টরে বড় ধরনের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।

উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে এনসিপির সদস্য সচিব আকতার হোসেন এমপি, বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব, সংরক্ষিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য জেসমিন সুলতানা জুঁই এবং বেইজিংয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাজল আলমসহ কুনমিংস্থিত বাংলাদেশ কনসুলেট ও ইউনান প্রাদেশিক সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

দিনের দ্বিতীয়ভাগে, মধ্যাহ্নভোজের পর ডেপুটি স্পিকারের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় দলটি কুনমিং থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘পাওথাও’ গ্রাম পরিদর্শন করেন। ভেষজ চিকিৎসার জনক সি জিয়াংয়ের স্মৃতিবিজড়িত ও ঔষধি গাছ সমৃদ্ধ এই গ্রামের ৮০ ভাগের বেশি মানুষ আদিবাসী, যারা শত শত বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী হারবাল ঔষধি গাছের চাষ ও পরিচর্যা করে আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দা জ্যাং অ্যানা ডেপুটি স্পিকারকে পুরো গ্রামটির ঐতিহ্য ও চাষ পদ্ধতি ঘুরে দেখান।