মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে রূপকথার এক রোমাঞ্চকর ম্যাচ দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। ৫ ওভার বাকি থাকতে হাতে ৫ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র ৯ রান। উইকেটে ১৪৯ রানে অপরাজিত থেকে একাই ম্যাচ ডমিনেট করছিলেন অজি ওপেনার কুপার কোনোলি। ঠিক এই সহজ সমীকরণ মেলাতেই অস্ট্রেলিয়া হারিয়ে বসল আরও ৪টি উইকেট, খরচ হলো ২৭টি বল! শরিফুল ইসলামের ফাইফার ও মোস্তাফিজের কাটার জাদুতে ৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে চরম নাটকীয়তার মুখে পড়ে সফরকারীরা। তবে শেষ ওভারের তৃতীয় বলে চার মেরে অস্ট্রেলিয়াকে ১ উইকেটের অবিশ্বাস্য এক জয় এনে দেন অ্যাডাম জাম্পা। এই শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা এড়ালো অস্ট্রেলিয়া, তবে প্রথম দুই ম্যাচ জেতায় ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে নিজেদের করে নিল স্বাগতিক বাংলাদেশ।
২৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনার কুপার কোনোলি ও বেন ইংলিস শুরু থেকেই ওয়ানডে মেজাজে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে থাকেন। তবে ইনিংসের পঞ্চম ওভারে বল হাতে এসেই দৃশ্যপট বদলে দেন নাহিদ রানার পরিবর্তে একাদশে ফেরা শরিফুল ইসলাম। ওভারে জোড়া আঘাত হেনে প্রথমে ইংলিস (২১) ও পরে ম্যাট রেনশকে (০) ফিরিয়ে বাংলাদেশকে খেলায় ফেরান তিনি।
এরপর অ্যালেক্স ক্যারিকে (৮) সৌম্য সরকারের এক অবিশ্বাস্য ডাইভিং ক্যাচে ফেরানোর পর, মার্নাস লাবুশানের (২৭) উইকেটটিও এক হাতে ঝাঁপিয়ে লুফে নেন উইকেটরক্ষক নুরুল হাসান সোহান। এই উইকেটটিও নেন শরিফুল। একপ্রান্তে নিয়মিত সঙ্গী হারালেও অন্যপ্রান্ত আগলে রেখে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম ও অনবদ্য এক সেঞ্চুরি তুলে নেন বাঁহাতি ওপেনার কুপার কোনোলি।ক্যামেরন গ্রিনের (২১) উইকেটটি শেখ মেহেদী তুলে নেওয়ার পর শেষদিকে রীতিমতো তাণ্ডব শুরু করেন কোনোলি। ৪৫তম ওভারে তাসকিন আহমেদকে হাকান ৩টি বিশাল ছক্কা। জয় যখন হাতছোঁয়া দূরত্বে, তখনই শুরু হয় আসল নাটক।৪৬তম ওভারে বল করতে এসে আবারও ত্রাতা হয়ে দাঁড়ান শরিফুল ইসলাম। ওভারের প্রথম বলে অলি পিককে (২৭) ফেরানোর পরের বলেই জ্যাভিয়ের বার্টলেটকে আউট করে ওয়ানডে ক্যারিয়ারে নিজের প্রথম ৫ উইকেট (ফাইফার) পূর্ণ করেন শরিফুল। নিজের পরের ওভারে এসে ডাওয়ারশুইসকে ফিরিয়ে ম্যাচে নিজের ৬ষ্ঠ উইকেটটি শিকার করেন এই বাঁহাতি পেসার।এরই মাঝে গালিতে অ্যাডাম জাম্পার একটি সহজ ক্যাচ মিস করেন তানজিদ হাসান তামিম, যা ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। ৪৯তম ওভারে মোস্তাফিজুর রহমান বোলিংয়ে এসে মাত্র ২ রান দিয়ে ম্যাচের মূল নায়ক কুপার কোনোলিকে (১৪৯) বোল্ড করে দিলে জয়ের সুবাস পেতে শুরু করে বাংলাদেশ। ২৬৬ থেকে ২৭১ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারিয়ে কাঁপতে থাকা অজিদের শেষ ওভারে দরকার ছিল ৩ রান। তাসকিন আহমেদের প্রথম দুই বলে ১ রান এলেও তৃতীয় বলে বাউন্ডারি মেরে অজিদের মুখে হাসি ফোটান জাম্পা।এর আগে টস জিতে ব্যাটিং করতে নেমে ইনিংসের প্রথম ওভারেই ৪ বল খেলে ২ রান করে জ্যাভিয়ের বার্টলেটের বলে বোল্ড হন সৌম্য সরকার। দ্বিতীয় উইকেটে তানজিদ তামিম (১৯) ও ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত (২৪) ৫৬ বলে ৫১ রানের জুটি গড়লেও খণ্ডকালীন স্পিনার ম্যাট রেনশর স্পিন ঘূর্ণিতে দুজনেই দ্রুত বিদায় নেন।৬১ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর দলের হাল ধরেন লিটন কুমার দাস ও তাওহীদ হৃদয়। ১০৯ বলে ৯৫ রানের জুটি গড়ার পর লিটন দাস ব্যক্তিগত ৪৮ রানে পায়ের পেশীতে টান (Cramp) লেগে মাঠ ছাড়েন। এরপর মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত মাঠে নেমেই চার মেরে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শুরু করেন। অপরপ্রান্তে তাওহীদ হৃদয় ৮৮ বলে ৮টি চারের সাহায্যে ইনিংস সর্বোচ্চ ৮৩ রান করে আউট হন। হৃদয় ফেরার পর মোসাদ্দেক ৪৩ বলে নিজের হাফ-সেঞ্চুরি পূরণ করেন। শেষ ওভারে লিটন দাস আবারও মাঠে ফিরে মিরপুরের মাটিতে নিজের প্রথম ওয়ানডে ফিফটি (৫৮*) তুলে নেন। মোসাদ্দেক ৫৬ রানে অপরাজিত থাকলে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ২৭৪ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ।অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে জ্যাভিয়ের বার্টলেট ও ম্যাট রেনশ ২টি করে উইকেট নেন। ম্যাচ হারলেও ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের আনন্দে মেতেছে টাইগার শিবির।