বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে লেবানন নিয়ে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো একটি স্থায়ী চুক্তি সম্পাদনের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। ২০২৬ সালের ২১শে জুন, সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন হ্রদের তীরে অবস্থিত বার্গেনস্টক বিলাসবহুল হোটেল কমপ্লেক্সে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তন ও কাতারের মধ্যে একটি চতুর্পাক্ষিক বৈঠকের দিনে প্রতিনিধিদলের কর্মীরা লবিতে মিলিত হন। যুদ্ধ শেষ করার একটি চুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আয়োজিত উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনার অংশ হিসেবে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। [এএফপি]

মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তন জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডে উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনার প্রথম দিনে তাদের ভাষায় “উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান “৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি রূপরেখায়” সম্মত হয়েছে।

১৭ জুন একটি ১৪-দফা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের একটি কাঠামো তৈরি করে এবং পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি স্থাপন করে।

উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে লেক লুসার্নে অনুষ্ঠিত ১২ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠকের পর এই অগ্রগতি সাধিত হয়।

যৌথ বিবৃতিতে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি “সংঘাত নিরসন সেল” গঠনের ঘোষণাও দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি, আরও আলোচনাকে সমর্থন করার জন্য একটি উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি এবং সরাসরি যোগাযোগের চ্যানেল তৈরির কথাও জানানো হয়।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন, তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এবং এতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।


তাহলে আলোচনাগুলো থেকে প্রাপ্ত মূল শিক্ষাগুলো কী কী?

উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি, যোগাযোগের মাধ্যম

আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা কাতার ও পাকিস্তনের জারি করা এক যৌথ বিবৃতি অনুসারে, “মধ্যস্থতার ওপর রাজনৈতিক তদারকি প্রদানের জন্য” একটি উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কমিটি “৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে” এবং আগামী দুই মাস ধরে আরও কারিগরি আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, “প্রধান আলোচকগণ উচ্চ পর্যায়ের কমিটির কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দেবেন এবং সমঝোতা স্মারকের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পারমাণবিক, নিষেধাজ্ঞা, একটি পর্যবেক্ষণ ও বিরোধ নিষ্পত্তি বিষয়ক কার্যকরী দলসহ অন্যান্য বিষয়ে নেতৃত্ব দেবেন।”

আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসী সিনিয়র ফেলো টমাস ওয়ারিক আল জাজিরাকে বলেছেন, কারিগরি আলোচনার পরবর্তী পর্যায়টি রাজনৈতিক চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে এবং অন্তবর্তীকালীন চুক্তিতে উল্লিখিত ৬০ দিনের সময়সীমার চেয়েও শেষ পর্যন্ত এতে বেশি সময় লাগতে পারে।

এই চুক্তিটি এমন এক সময়ে হয়েছে যখন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যার মধ্যে রয়েছে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে কিনা, তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের পরিধি এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সময়সীমা।

পারমাণবিক ইসুুতে ওয়ারিক বলেন, “সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ বা এর মাত্রা কমানোর জন্য কয়েক হাজার লোকের প্রয়োজন হবে, সম্ভবত ১,০০০ আমেরিকানকে ইরানের সবচেয়ে সংবেদনশীল কিছু পারমাণবিক কেন্দ্রে যেতে হবে”, তিনি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হ্রাস করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার জন্য ওয়াশিংটনের দাবির কথা উল্লেখ করে এ কথা বলেন।

“আমি কল্পনাও করতে পারি না যে ইরান এই ধারণায় খুব খুশি হবে,” তিনি আরও বলেন।

পক্ষগুলো হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে একটি যোগাযোগ ব্যবস্থাও স্থাপন করেছে, যার উদ্দেশ্য হলো ‘হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে’ বিভিন্ন ঘটনা ও ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো।

এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে সামুদ্রিক যান চলাচলে অব্যাহত বিঘ্ন ঘটছে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রবিবার প্রণালীটি দিয়ে ১২টি জাহাজ চলাচল করেছে, যা আগের দিনের ৩৫টি জাহাজের তুলনায় অনেক কম।

প্রণালীটির ওপর ইরানের কার্যত অবরোধ একটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করে, যা বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল।

ছবি- ২০২৬ সালের ২১শে জুন সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন হ্রদের তীরে অবস্থিত বার্গেনস্টক বিলাসবহুল হোটেল কমপ্লেক্সে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তন ও কাতারের মধ্যে একটি চতুর্পাক্ষিক বৈঠকের আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি (বাম) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরীফের (মাঝখানে) সঙ্গে পাকিস্তনের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের (ডান) পাশে করমর্দন করছেন [এএফপি]


লেবাননের জন্য সংঘাত নিরসন সেল

এই চুক্তিতে একটি “সংঘাত নিরসন সেল” গঠনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো “লেবাননে সামরিক অভিযান সমাপ্তির প্রতিপালন নিশ্চিত করার” প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা।

আরাঘচি লেবাননে যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির” কথাও ঘোষণা করেছেন, তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই চুক্তির প্রথম আসল পরীক্ষা হবে “লেবানন সংঘাত নিরসন সেল”-এর কার্যকারিতা।

এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যতদিন প্রয়োজন মনে হবে, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের একটি নিরাপত্তা অঞ্চলে অবস্থান করবে। ইসরায়েল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই বাফার জোনটি প্রায় ৬০২ বর্গকিলোমিটার (২৩০ বর্গমাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা লেবাননের ভূখ-ের প্রায় ৬ শতাংশ।

এরপর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কুদস ফোর্সের প্রধান ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবানন ছেড়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেন, অন্যথায় ২০০০ সালে দেশটি থেকে তাদের প্রত্যাহারের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থাকবে।

রাষ্ট্রীয় প্রেস টিভির তথ্যমতে, ইসমাইল কানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন যে, ইসরায়েল যদি তার “আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব” অব্যাহত রাখে, তবে তাকে “অপমান ও পরাজয়ের” সাথে বিতাড়িত করা হবে। এদিকে, হিজবুল্লাহ এই চুক্তি নিয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে আল জাজিরার নুর ওদেহ জানিয়েছেন যে, ইসরায়েলি ভাষ্যকাররা সুইজারল্যান্ড আলোচনার ফলাফলকে ইসরায়েলের জন্য একটি কৌশলগত উভয়সঙ্কট হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

“হিজবুল্লাহর সঙ্গে অতীতের যুদ্ধবিরতিটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল। এটি ইসরায়েলকে পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিল,” তিনি বলেন।

কিন্তু এবার পরিস্থিতিটা ভিন্নৃ এবং ইসরায়েল মনে করছে যে তারা এর সাথে তাল মেলাতে বাধ্য হবে। এই মুহূর্তে ইসরায়েলের চিন্তভাবনা, পরিকল্পনা এবং কূটকৌশলগুলো এই বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে যে, ইসরায়েলি জনগণের আস্থা পুরোপুরি না হারিয়ে ইসরায়েল কতটা আপস করতে পারে।

কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন যে এই ব্যবস্থাটি লেবাননের বাস্তব ক্ষেত্রে কীভাবে প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক জোযড় হুড উল্লেখ করেছেন যে, এই ব্যবস্থাটি প্রণয়নের আলোচনায় লেবানন বা ইসরায়েলি কোনো সরকারই সরাসরি জড়িত ছিল না, যদিও এখন যেকোনো যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়।

“সুতরাং এটি লেবাননের ওপর ইরানকে সেই ভেটো ক্ষমতা দিচ্ছে--- তাই সমঝোতা স্মারকটি যেন বলছে, আমরা ইরানের আঞ্চলিক নেতৃত্বের ভূমিকা মেনে নিচ্ছি, যার মধ্যে তার প্রক্সিগুলোর ওপর নেতৃত্বও অন্তর্ভুক্ত,” তিনি বলেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রাক্তন কর্মকর্তা এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক জেনারেল মার্ক কিমিট আরও বলেন যে, বৃহত্তর আলোচনায় লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা বিষয়টিকে “অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে”।

তিনি আরও বলেন, “বাস্ততা হলো, দুটি ভিন্ন দেশের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ সংঘাতে বহিরাগত শক্তিগুলো খুব কমই কোনো অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করতে পারে।”

তবে প্রাথমিক লক্ষণ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে চুক্তিটির কিছুটা প্রভাব পড়েছে। আল জাজিরার হাইডি পেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননে “যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে শুরু করায় নাবাতিয়ায় একটি সতর্কতামূলক শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে”।

“এই শহর এবং এর আশেপাশের শহর ও গ্রামগুলোর জন্য অত্যন্ত নৃশংস ও রক্তক্ষয়ী কয়েকটি দিনের পর এটি ঘটেছে,” তিনি আরও বলেন।


নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, জব্দকৃত সম্পদ

আরাঘচি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই চুক্তিতে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ছাড় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রকাশ্যে তা নিশ্চিত করেনি।

এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, ইরানের তেল রপ্তানি ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে, অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছে, ইরানের কিছু জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা হয়েছে এবং ইরানের জন্য একটি বড় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে।

তিনি এই পদক্ষেপগুলোকে ইরানের দেওয়া প্রধান শর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা এখন পূরণ করা হয়েছে।

তবে, ওয়ারিক সতর্ক করেছেন যে ওয়াশিংটনে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যেখানে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।

“এই চুক্তি নিয়ে কংগ্রেস এখন খুবই অসন্তুষ্ট। এবং ইরান যেসব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চায়, কংগ্রেস তাতে রাজি হবে কি না, তা একেবারেই স্পষ্ট নয়,” তিনি বলেন।