মেক্সিকো ’৮৬, ফ্রান্স ’৯৮, জাপান ’০২—বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া মানেই কেবল ১১ জন খেলোয়াড়ের লড়াই নয়; বরং ইতিহাস, আবেগ, বিতর্ক আর পুরোনো ক্ষতের এক মিশেল। আজ বুধবার দিবাগত রাত ১টায় ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে লাতিন আমেরিকার জায়ান্ট আর্জেন্টিনা ও ইউরোপীয় পরাশক্তি ইংল্যান্ড।
তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগে দুই দলের ক্যাম্প থেকেই এসেছে অভিন্ন বার্তা—এবারের লড়াইটি কোনো যুদ্ধ নয়, কেবলই ফুটবল।
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস (মালভিনাস) যুদ্ধের ইতিহাস এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের বৈরিতার ছায়া প্রায়ই এই ম্যাচে পড়ে। কিন্তু সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি সব বিতর্ক উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘না, না, না। এটি শুধুমাত্র একটি ফুটবল ম্যাচ। অন্য কোনো বিষয় টেনে আনার দরকার নেই।’
আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পলও সুর মিলিয়েছেন কোচের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি এটি ঐতিহাসিক গুরুত্ববহ ম্যাচ। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে এটি ফুটবল। যা ঘটেছিল তা ছিল ট্র্যাজেডি, কিন্তু মাঠে আমাদের লক্ষ্য একটাই—জিতে ফাইনালে ওঠা।’
দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ১৯৮২ সালে সংঘটিত যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ৯ শতাধিক মানুষ। সেই ক্ষোভ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ যেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার পায়ে ফুটে উঠেছিল। ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং পরবর্তী শতাব্দীসেরা গোলটিকে অনেকেই যুদ্ধের প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে দেখেন। যদিও ম্যারাডোনা পরবর্তীতে একে ‘দুই খুনি সরকারের অর্থহীন যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ মানেই বর্ণাঢ্য ইতিহাস: ১৯৬৬ ওয়েম্বলিতে আর্জেন্টিনার অ্যান্তোনিও রাত্তিনকে মাঠ থেকে পুলিশের সহায়তায় বের করে দেওয়ার ঘটনা ফুটবলে ‘হলুদ ও লাল কার্ড’ প্রবর্তনের পথ প্রশস্ত করে। ১৯৯৮ ডেভিড বেকহ্যামের সেই বিতর্কিত লাল কার্ডের ম্যাচটি আজও ভক্তদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টারে পৌঁছেছিল। ২০০২ সর্বশেষ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলে ইংল্যান্ডের জয়। এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর পর আজ ফের প্রতিযোগিতামূলক লড়াইয়ে নামছে দুই দল।
দুই দলের ইতিহাসে রয়েছে অসংখ্য তিক্ত স্মৃতি ও বিতর্কের পাহাড়। তবে এবারের সেমিফাইনাল ঘিরে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড উভয় শিবিরই চায় মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে। একদিকে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা চাইবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে, অন্যদিকে ইংলিশ বাহিনী মরিয়া তাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বকাপ খরা কাটাতে।
সব বিতর্ক আর ইতিহাসের পাতা উল্টে আজ রাতে ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষায় এক সুন্দর লড়াইয়ের। মাঠের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হোক ফুটবলই!