কওমি ঘরানার দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগে সক্রিয় হেফাজতে ইসলাম। নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের লক্ষ্যে ৩ আগস্টের মধ্যে দলগুলোর লিখিত মতামত চাওয়া হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কওমি ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো জামায়াত, বিএনপি ও স্বতন্ত্র– তিন ধারায় বিভক্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ভেতরেও দৃশ্যমান বিভাজন তৈরি হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থান নেওয়া দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্যে কাদা ছোড়াছুড়ির ঘটনাও ঘটে। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে কওমি ধারার সব ইসলামী দলকে এক ছাতার নিচে এনে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
এ লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে থাকা দলগুলোকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে তাদের অবস্থান ও করণীয় সম্পর্কে লিখিত মতামত দিতে বলা হয়েছে। এরপর নতুন জোটের কাঠামো চূড়ান্ত করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ ভবিষ্যৎ নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর আহ্বানে কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামী দলের নেতাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা ও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়।
আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিস এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সাতটি ইসলামী দলের নেতারা ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য পোষণ করেন।
হেফাজত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নতুন এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বর্তমানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট, বিএনপির রাজনৈতিক বলয় কিংবা স্বতন্ত্র অবস্থানে থাকা কওমি ঘরানার দলগুলোকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। এজন্য দলগুলোকে তাদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে নতুন জোটে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে লিখিত মতামত দিতে বলা হয়েছে। হেফাজতের নেতারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দলগুলোকে অবস্থান স্পষ্ট করতে বলা হয়েছে।
হেফাজত সূত্রের দাবি, যারা নতুন জোটে থাকতে চাইবে, তাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে বেরিয়ে এসে অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যোগ দিতে হবে। এ কারণেই রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টিকে জামায়াত ও বিএনপির বলয় ছাড়ার বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা। ওই নির্বাচনে কওমি ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো একক কোনো প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারেনি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে যোগ দেয় মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস এবং নেজামে ইসলাম পার্টি নির্বাচনে অংশ নেয়। অন্যদিকে পীর সাহেব চরমোনাইয়ের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শুরুতে জামায়াতের সঙ্গে থাকলেও পরবর্তী সময়ে আসন বণ্টন নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে শেষ পর্যন্ত এককভাবে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। আবার জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ কওমি ঘরানার আরও কয়েকটি দল বিএনপির রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে কওমি ঘরানার ভোট ও রাজনৈতিক শক্তি কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
হেফাজতের নেতারা জানিয়েছেন, লিখিত মতামত পাওয়ার পর নতুন রাজনৈতিক জোটের কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে। এরপর স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচনেও সমন্বিতভাবে বা একক প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
হেফাজতের নেতাদের মতে, এই বিভক্তির কারণে কওমি ধারার রাজনৈতিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই আগামী দিনে অভিন্ন নেতৃত্ব ও সমন্বিত রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে ইসলামপন্থি ভোটকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা চলছে। নতুন জোট গঠনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত সমন্বিতভাবে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মীর ইদ্রিস বলেন, আগে হেফাজতের মধ্যে ঐক্য ছিল। কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিছু দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে এবং কিছু দল বিএনপির রাজনৈতিক বলয়ে চলে যাওয়ায় নিচের সারির নেতাকর্মীদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, এ কারণেই হেফাজতের আমির সবাইকে নিয়ে বৈঠক করেছেন। যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে রয়েছেন, তাদের করণীয় বিষয়ে লিখিত মতামত দিতে বলা হয়েছে। আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে মতামত জমা দিতে হবে। এরপর পরবর্তী বৈঠকে সেসব মতামতের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠন ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ ভবিষ্যৎ নির্বাচনে কওমি ঘরানার দলগুলো একক প্রার্থী দেবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা মীর ইদ্রিস বলেন, আগে জোট গঠন হোক। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৈঠকের বিষয়ে হেফাজতের আরেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, কওমি ঘরানার দলগুলোকে নিয়ে আলাদা একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের লক্ষ্যে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। সামনে আরও কয়েকটি বৈঠক হবে। সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। মূলত কওমি ধারার দলগুলোকে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
আপনার কি এই রাজনৈতিক জোট গঠনের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বা এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য রাজনৈতিক ঘটনা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার আগ্রহ আছে?