রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় পূর্ব শত্রুতার জেরে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইব্রাহিম পলাশ নামে বিএনপির এক কর্মীকে। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। নৃশংসভাবে হত্যার পর কেটে নেওয়া হয় তার দুই হাতের কব্জি। মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে থাকলেও এখন পর্যন্ত তার দুই হাতের কব্জি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
মঙ্গলবার (২০ জুলাই) সবুজবাগের রাজারবাগ বাজারের পানির পাম্পসংলগ্ন একটি মুদিদোকানের সামনে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইব্রাহিম পলাশকে।
আরও পড়ুন সবুজবাগে পূর্বশত্রুতার জেরে যুবককে কুপিয়ে হত্যা হাজারীবাগে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত মালয়েশিয়ায় বহুতল ভবন থেকে পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু
নিহত পলাশের বড় বোন জোসনা বেগম বলেন, ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে জামিয়াতুল সালেহা মহিলা মাদ্রাসায় পড়া আমার মেয়ে জান্নাতের জন্য খাবার নিয়ে আমার বাসা থেকে বের হয় পলাশ। খাবার দিয়ে পলাশ তাকে জানায় কালিবাড়ি এলাকায় তার কাজ আছে, সে সেখানে যাবে। এরপর খবর পেলাম আমার ভাইকে কারা যেন কুপিয়ে ফেলে গেছে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়ার পর আমার ভাই মারা যায়। কি নৃশংসভাবে আমার ভাইকে হত্যা করেছে আপনারা দেখেন, তার দুটি হাতও কেটে নিয়েছে। সে পাঁচ মাস আগে বিয়ে করেছে, সংসারটিকে গুছিয়ে নিচ্ছিল কিন্তু তারা আমার ভাইকে বাঁচতে দিল না। কয়দিন আগেও তাকে এক লাখ টাকা দেই, সে একটি মোটরসাইকেল কেনে। আমরা দুই ভাই এবং দুই বোন ছিলাম। ভাই ও বোনের মধ্যে পলাশ ছিল তৃতীয়।
কান্না জড়িত কণ্ঠে নিহত পলাশের স্ত্রী মরিয়ম বলেন, ‘তিন দিনের সম্পর্ক, এরপর পাঁচ মাস আগে আমাদের বিয়ে। সংসার জীবন ভালোই চলছিল। ভালোবেসে বিয়ে করলাম কিন্তু জীবনসঙ্গীকে নিয়ে সংসার ঠিক করা হলো না। আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, এই মাসেই আমার রেজাল্ট হওয়ার কথা। নৃশংসভাবে সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে এভাবে হত্যা করল কোনোভাবেই আমরা মেনে নিতে পারছি না। আমার তো আর কিছুই রইল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার দিন দুপুরবেলা সে বাসায় ছিল, খাওয়া-দাওয়া শেষে বাসা থেকে বের হয়। আমি একটি টিউশনি করাতাম সেখান থেকে টাকা আনার জন্য দুপুরে তাকে না বলে বাসা থেকে বের হই। এরপর সে আমাকে একবার ফোন দিলে আমি টের পাইনি। বাসায় আসার পর তাকে আমি একটি মেসেজ দেই 'আর কখনো এরকম হবে না সরি, তোমাকে না বলে গেছি' সে মেসেজটি সিন করলেও কোনো রিপ্লাই দেয়নি। রাত আটটা থেকে সোয়া আটটার মধ্যে বাসায় এসে একজন বলল, আপনারা কিছুই জানেন না? পলাশ ভাইকে তো কারা যেন কুপিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে গেছে। পরে আমরা খবর পেয়ে মুগদা মেডিকেলে যাই, যেয়ে জানতে পারি ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেছে। সেখানে যেয়ে দেখলাম আমার ভালোবাসার মানুষটি আর নেই। নৃশংসভাবে তারা আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে, তার দুটি হাত কেটে নিয়ে গেছে।’
কারও সঙ্গে ঝগড়া বা কিছু হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কার সঙ্গে রাজনীতি করত, বাইরে কি করত, এসব বিষয়ে আমি জিজ্ঞাসা করতাম না। জানতে পেরেছিলাম কয়েকদিন আগে মোবাইল নিয়ে তাদের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল পরে বিষয়টি মীমাংস হয়ে গেছে। কোথা থেকে কি কারণে কারা এই ঘটনাটি ঘটালো সে বিষয়টি এখনো জানতে পারিনি। বিয়ের অল্পদিন হয়েছে, তার সব বিষয়ে এখনো জানতে পারিনি।
সুরতাহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পলাশের মাথায়, ঘাড়ে, বুকে ও কোমরে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং ডান ও বাম হাত দুটি কব্জি থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং অস্ত্রের আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে।
যে ঘটনা থেকে সূত্রপাত একটি সিসিটিভি ফুটেজ দেখা যায়, গত ১৫ জুলাই একটি রিকশার গ্যারেজে কয়েকজন যুবক এসে সাদাশার্ট পরিহিত এক ব্যক্তির ওপর হামলা করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, এখানে রিকশার গ্যারেজের ম্যানেজারকে চাঁদার জন্য রয়েল, সবুজ ও শফিক তার ওপর হামলা করে।
এছাড়াও, পলাশকে হত্যার দিন (২১ জুলাই) রাত ৮টা ১০ মিনিটে আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হাতে সামুরাই নিয়ে দৌঁড়ে এসে একজনকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে কুপাচ্ছে এক ব্যক্তি। স্থানীয়রা জানান, যে ব্যক্তি এলোপাতাড়ি কোপাচ্ছে তিনি স্থানীয় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তার নাম রয়েল। তিনি হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্র সামুরাই দিয়ে পলাশকে এলোপাতাড়ি কুপিয়েছেন।
তবে, এর আগে রয়েলের সঙ্গে চলা কয়েকজন এসে পলাশকে দেখে যান। তাদের দেখে গিয়ে ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার পর প্রকাশ্যে এসে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর সবুজবাগের রাজারবাগ বাজারে পানির পাম্পসংলগ্ন একটি মুদি দোকানের সামনে হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। এ সময় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে তাকে মুগদা হাসপাতালে নিয়ে গেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢামেকের পাঠানো হয়, সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, গতকাল ইব্রাহিম পলাশ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং তার দুটি হাত কেটে নেওয়া হয়। পরে আমরা সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে তার মরদেহের ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতাল মর্গে পাঠাই।
কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড টি ঘটেছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার সঙ্গে রয়েল নামে এক ব্যক্তি চলাফেরা করত। আর্থিক লেনদেন নিয়ে পলাশের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। পরে এটি নিয়ে হাতাহাতির এক পর্যায়ে রয়েলের মায়ের গায়ে হাত লাগে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রয়েলসহ বেশ কয়েকজন মিলে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটায়।
সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, সিসি ফুটেজে এই হত্যাকাণ্ডে আমরা চারজনকে দেখতে পেয়েছি। এখন পর্যন্ত আমরা কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আমাদের অভিযান চলছে।
তার যে দুটি হাত কেটে নিয়েছে, সেই হাত দুটি উদ্ধার করতে পেরেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা তার দুটি হাত উদ্ধার করতে পারিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, রিকশা চুরির ঘটনা নিয়ে মূলত এ হত্যাকাকাণ্ডের সূত্রপাত। কিডনি পঁচা সবুজ নামে এক কিশোর গ্যাং লিডার বাসাবো কলোনী থেকে একটি রিকশা চুরি করে। রিকশা চুরির পর রিকশার মালিকরা রিকশা ও চোরকে খুজছিলো। এ বিষয়ে নিহত পলাশের কাছে বিচার দেয় রিকশার মালিকরা।
এছাড়াও, কিছুদিন আগে বাগপাড়া হিজরা বিল্ডিং এর পাশ থেকে রসুলের গ্যারেজে ঢুকে গ্যারেজ মিস্ত্রীকে মারধর করে চাঁদা চায় কিডনি পঁচা সবুজ। এসব ঘটনায় সবুজকে জিজ্ঞেস করলে কিশোর গ্যাং লিডার রয়েল কিডনী পঁচা সবুজের হয়ে নিহত পলাশকে খুঁজতে বের হয়। বিষয়টি নিয়ে তিন-চারদিন আগে রয়েলের বাসায় নিহত পলাশ কথা বলতে গেলে তার ওপর হামলা করা হয়।
গতকাল (মঙ্গলবার) রাতে মোবাইল চুরির কারণে সবুজবাগ এলাকার শীর্ষ মোবাইল চোর 'দুখু'-কে স্থানীয়রা আটক করে। ওই সময় পলাশ বিষয়টি মীমাংসা করে। এমন খবর শুনে রয়েল, গুরুদাস, সবুজ ও শফিক হঠাৎ করে দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে এসে পলাশের ওপর আকস্মিক হামলা করে। এরপর তাকে কুপিয়ে হত্যার পর দুই হাতের কবজি কেটে নিয়ে যায় ওই সন্ত্রাসীরা।
এদিকে, হত্যার ঘটনায় গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, রয়েল ও গুরুদাসকে সবুজবাগ এলাকায় শেল্টার দেয় ইলিয়াস বাবু ওরফে ভিডিও বাবু। হত্যার আগে তার বাসায় বসেই নিহত পলাশকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।