ইতিহাসের পাতায় ক্ষমতার পরিবর্তন কিংবা একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পতন সবসময়ই সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনার একটি। আর এই পরিবর্তন যখন রুপালি পর্দায় ফুটে ওঠে, তখন তা শুধু বিনোদন নয়, বরং ইতিহাস ও রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়। বিশ্বসিনেমায় এমন বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যেখানে কীভাবে একটি শক্তিশালী স্বৈরাচারী সরকার ধসে পড়ে এবং গণমানুষের প্রতিবাদের জয় হয়, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখানো হয়েছে।
ক্ষমতার দাপট, রাজকীয় পতন ও গণ-অভ্যুত্থানের গল্প নিয়ে নির্মিত এমনই কালজয়ী ছয়টি সিনেমা নিয়ে এই প্রতিবেদন।
জার্মান চলচ্চিত্র 'ডাউনফল' মূলত নাৎসি জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের শাসনের শেষ দিনগুলোর প্রেক্ষাপটে নির্মিত। অলিভার হার্শবিগেল পরিচালিত এই সিনেমায় দেখা যায়, কীভাবে চারপাশে মিত্রবাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে বাঙ্কারে বসে একটি পুরো সরকার ব্যবস্থার চরম পতন প্রত্যক্ষ করছেন তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব। কোনো শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা যখন ভেতরে ভেতরে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, তখন তার করুণ পরিণতি কেমন হতে পারে—তার এক অনন্য দলিল এই সিনেমাটি।
চিলির কুখ্যাত একনায়ক অগাস্টো পিনোচেতের শাসন পতনের সত্য ঘটনা নিয়ে নির্মিত চিলির বিখ্যাত সিনেমা 'নো'। ১৯৮৮ সালে চিলিতে পিনোচেতের রাজত্ব শেষ করতে একটি ঐতিহাসিক গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। সামরিক সরকারের সর্বাত্মক বাধা সত্ত্বেও দেশের তরুণ প্রজন্ম কীভাবে সৃজনশীল প্রচারণাকে কাজে লাগিয়ে জনগণকে জাগ্রত করেছিল এবং রক্তপাত ছাড়াই একটি স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, সিনেমাটিতে সেই গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
‘নো’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য। ছবি- ফ্লিক্স।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী জোসেফ স্ট্যালিনের আকস্মিক মৃত্যুর পর কীভাবে পুরো সরকার ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছিল, তা নিয়ে নির্মিত রাজনৈতিক স্যাটায়ার চলচ্চিত্র এটি। স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও সহযোগীদের মধ্যে ক্ষমতা দখলের নোংরা রাজনীতি এবং ভেতরের কোন্দল এতে স্যাটায়ারের ছলে নির্মম সত্যের সাথে দেখানো হয়েছে। ক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তির পতনের পর কীভাবে সম্পূর্ণ সরকারব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, তা এতে ফুটে উঠেছে।
একটি কাল্পনিক ও ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে এই থ্রিলার সিনেমাটি। রাষ্ট্র যখন জনগণের মৌলিক অধিকার ছিনিয়ে নেয় এবং চরম দমনপীড়ন চালায়, তখন কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের প্রতীকী প্রতিবাদ ধীরে ধীরে পুরো দেশের গণমানুষের দাবিতে রূপ নেয়, তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মুখোশধারী এক বিপ্লবীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজপথে জনতার যে ঢল নামে, তা মূলত একনায়কতন্ত্রের পতনেরই চূড়ান্ত বারতাই দেয়।
উগান্ডার নির্মম একনায়ক ইদি আমিনের রাজত্ব ও তার পতনের চূড়ান্ত পর্যায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই সিনেমায়। এক তরুণ স্কটিশ চিকিৎসকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্মিত এই গল্পে দেখানো হয়েছে কীভাবে ক্ষমতার মোহে অন্ধ একজন শাসক নিজের দেশ ও জনগণকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ইদি আমিনের দাপট এবং পরবর্তীতে তার সরকারের অশুভ পতন কীভাবে একটি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছিল, তা সিনেমাটিতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
‘দ্য লাস্ট কিং অব স্কটল্যান্ড’ সিনেমায় উগান্ডার স্বৈরশাসক ইদি আমিনের চরিত্রে ফরেস্ট হুইটেকার।
মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি 'ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল' এবং এর জেরে ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ঘটনা নিয়ে নির্মিত কালজয়ী ছবি এটি। দুই তরুণ সাংবাদিক কীভাবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অপরাধ উন্মোচন করেছিলেন, যার পরিণতিতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল—তা এই সিনেমায় চমৎকারভাবে দেখানো হয়েছে। কোনো রাজপথের আন্দোলন ছাড়া কেবল সত্য প্রকাশের মাধ্যমে কীভাবে সরকারের পতন ঘটানো যায়, তা এই সিনেমার মূল উপজীব্য।