ভারতে একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণদের গড়ে তোলা অভূতপূর্ব ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আন্দোলন এখন নরেন্দ্র মোদি সরকারের সামনে অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্দোলন সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবার দ্রুত বিচার আদালত (ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট) গঠনের ঘোষণা দিলেও বিক্ষোভকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভারতের শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, আমাদের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ও কল্যাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না। তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলবে, তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মোদির এই ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের আশ্বাসকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন সিজিপির মুখপাত্র সৌরভ দাস। তিনি বলেন, এটি কেবল সাময়িক মলম লাগানোর মতো প্রচেষ্টা, এর মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে না। গত এক দশকে কোনো দোষী সাজা পায়নি, তাই এই আশ্বাসের কোনো কার্যকর মূল্য নেই। উল্লেখ্য, দিল্লির যন্তর মন্তরে তীব্র গরম ও আর্দ্রতার মধ্যেও হাজার হাজার আন্দোলনকারী অবস্থান নিয়েছেন। গত সোমবার দিল্লি পুলিশ পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রায় বাধা দিয়ে লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করার পরও বিক্ষোভ থামেনি। ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রধান রাহুল গান্ধী এ ইস্যুতে সরকারের ওপর তীব্র আক্রমণ চালিয়েছেন। তিনি বলেন, গত এক দশকে দেশে ১৫২টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, অথচ একজনকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আর সরকার শূন্য ভূমিকা পালন করছে। বিরোধী নেতাদের দাবি, নরেন্দ্র মোদি তার ক্ষমতার প্রথম দুই মেয়াদের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নেই। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ মেনে নিলে তা নিজের দুর্বলতা হিসেবে প্রকাশ পাবে—এই ভয় থেকেই মোদি সরকার পিছু হঠছে না। বর্তমানে দিল্লি ছাড়িয়ে মুম্বাই, চেন্নাই, হায়দরাবাদ ও পাতিয়ালাসহ ভারতের বেশ কয়েকটি প্রধান শহরে এই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
আজ দেশজুড়ে আন্দোলনের ডাক ‘ককরোচ পার্টির’: ভারতের বিভিন্ন স্থানে চলমান পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে আজ শুক্রবার দেশব্যাপী ‘শান্তিপূর্ণ’ বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে জনপ্রিয় সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকারী গোষ্ঠী ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। গত ২০ জুলাই ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে আয়োজিত সফল পদযাত্রার পর এই নতুন কর্মসূচির কথা জানাল সংগঠনটি। “প্রতিটি জেলা, এক দিন, এক দাবি”—এই বার্তা নিয়ে প্রকাশিত ব্যানারে দেশের সাধারণ মানুষকে পুলিশি নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এই কর্মসূচি সফল করতে স্থানীয় ছাত্র ইউনিয়ন ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে সার্বিক সহায়তার নির্দেশনা দিয়েছে দলটি।
বিতর্কিত ভূমিকা পুলিশের, ছররা গুলিতে আহত শতাধিক: ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে সাদা পোশাক পরা কিছু ব্যক্তির লাঠি হাতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও দমনকাজে অংশ নেওয়ার দৃশ্য ঘিরে ভারতে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। পরনে সাধারণ শার্ট, ট্রাউজার আর চটি, কিন্তু মাথায় পুলিশের হেলমেট ও হাতে লাঠি—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন একাধিক ছবি ও ভিডিও জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ইউনিফর্ম এবং নেমট্যাগ ছাড়া এভাবে পুলিশ মোতায়েন আইনশৃঙ্খলার নামে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। এদিকে, আন্দোলন দমনে পুলিশের বিরুদ্ধে চরম সহিংসতা ও ছররা গুলি (প্যালেট গান) ব্যবহারের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ফুটেজে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশকে মারাত্মক বলপ্রয়োগ করতে দেখা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের এই দমনপীড়নে এ পর্যন্ত অন্তত ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আন্দোলনকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারগ্যাসের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি ছররা গুলি চালানো হয়েছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বাতিল হচ্ছে সংঘর্ষে যুক্তদের পাসপোর্ট: সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে তৈরি হওয়া সংঘর্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পথ হাঁটছে প্রশাসন। দিল্লি পুলিশের উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সহিংসতা ও দাঙ্গায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট বাতিল করার প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও রেকর্ডিং এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রমাণের সাহায্যে ‘সহিংসতায়’ সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। দেশের সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান অনুযায়ী, যারা এই সহিংসতায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, তাদের পাসপোর্ট বাতিলের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
‘জরুরি অবস্থা’র সঙ্গে তুলনা করে নিন্দা বিরোধীদের: বিক্ষোভের জেরে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী দিল্লিতে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দিল্লির প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেসের সমস্ত দোকানপাট, অফিস এবং রেস্তোরাঁ গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার মধ্যে বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ‘নিউ দিল্লি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন’। এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যন্তর মন্তর ও আন্দোলনস্থলের চারপাশে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েনের কড়া সমালোচনা করেছেন আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন্দ্র সরকার কি আবারও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে? অন্যদিকে, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্য কে সি বেণুগোপাল দিল্লির এই থমথমে পরিবেশকে ‘জরুরি অবস্থা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বাসভবনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পুরো দিল্লি জুড়েই যেন জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। তারা একে একে একেবারে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতে রূপ দিচ্ছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, টিওআই, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।