যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠেয় অবৈধ ইসরাইলি বসতির জমি বিক্রির একটি বিতর্কিত প্রদর্শনী অবিলম্বে বন্ধের জোরালো দাবি উঠেছে। প্রায় ১০০ জন ব্রিটিশ সংসদ সদস্য (এমপি) এবং হাউস অব লর্ডসের সদস্য (পিয়ার্স) এই দাবি জানিয়ে সরকারের কাছে একটি যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের আয়োজনকে প্রশ্রয় দিলে তা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্তরাজ্যকেও জড়িয়ে ফেলতে পারে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে এমপিরা উল্লেখ করেছেন, এই প্রদর্শনীটি ইসরাইলের ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ প্রকল্পের একটি অংশ, যা মূলত বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জমি বিক্রির সুবিধা করে দিচ্ছে। একদিকে যখন নতুন বসতি স্থাপনকারীদের ফিলিস্তিনের চুরি যাওয়া জমি কেনার আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে ইসরাইল কর্তৃক বিতাড়িত ফিলিস্তিনি শরণার্থী এবং তাদের বংশধরদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিজেদের ভূমিতে ফেরার আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এমইই-এর নিজস্ব এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি অবৈধ ইসরাইলি বসতি নির্মাণের সঙ্গে জড়িত। গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কি এবং ইয়োর পার্টির নেতা ও সাবেক লেবার প্রধান জেরেমি করবিনসহ শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এই গোপন প্রদর্শনীটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন।
গত মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত একই ধরণের একটি প্রদর্শনী নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্টারসেপ্ট’ এক প্রতিবেদনে জানায়, সেখানে অন্তত একটি টেবিলে দখলকৃত অঞ্চলের কাফার এলদাদ ও কার্নাই শোমরনসহ বিভিন্ন ইসরাইলি বসতির জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল।
‘দ্য গ্রেট ইসরাইলি রিয়েল এস্টেট ইভেন্ট’ নামের এই বিতর্কিত প্রদর্শনীটি আজ রোববার (১৪ জুন) লন্ডনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বিক্ষোভ ও আইনি জটিলতা এড়াতে এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান কঠোরভাবে গোপন রেখেছে আয়োজকরা।
মিডলব্রো ও থর্নাবি ইস্টের ব্রিটিশ এমপি অ্যান্ডি ম্যাকডোনাল্ড গত শুক্রবার (১২ জুন) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এই যৌথ বিবৃতিটি প্রকাশ করেন। তিনি যুক্তরাজ্য সরকারকে অবিলম্বে এই আয়োজন বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা বজায় রাখার এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার একটি বড় সুযোগ এসেছে সরকারের সামনে।
লন্ডনের মেয়র সাদিক খানও পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতির সম্পত্তি বিক্রির যেকোনো প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং লন্ডনে এ ধরনের আয়োজন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই (এমইই) জানিয়েছে, আইনবিষয়ক বিভিন্ন গোষ্ঠী লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশকে ‘সিরিয়াস ক্রাইম প্রিভেনশন অর্ডার’-এর অধীনে এই প্রদর্শনী বন্ধ করা যায় কি না, তা তদন্ত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
এই আয়োজনের অন্যতম স্পন্সর ‘ইমানুয়েল গ্রুপ’-এর প্রধান নির্বাহী ইমানুয়েল ভাতারি অংশগ্রহণকারী কোম্পানিগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন। এই তালিকায় রয়েছে ‘হারে জাহাভ’ নামের একটি ইসরাইলি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি, যারা দখলকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণ হেব্রন পাহাড়ের একটি অবৈধ বসতিতে সম্পত্তি বিক্রির বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। তালিকায় থাকা অপর একটি প্রতিষ্ঠান ‘দ্য মেশুলাম লেভিনস্টাইন গ্রুপ’ও অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং জেরুজালেমের অবৈধ বসতিগুলোতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্প নির্মাণ করে আসছে।
এমতাবস্থায়, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউকে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ব্রিটিশ সরকারকে যুক্তরাজ্যের মাটিতে এই আয়োজন প্রতিহত করতে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলি সরকার অবৈধ বসতিগুলোতে অর্থায়ন বৃদ্ধি করেছে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার হার বাড়িয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলিদের তৈরি করা সমস্ত বসতি, সম্পত্তি এবং আবাসন প্রকল্প সম্পূর্ণ অবৈধ ও যুদ্ধাপরাধের শামিল।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য সমূহ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!