পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর এক সময় যা ছিল কল্পনাতীত, শেষ পর্যন্ত সেটাই বাস্তবে রূপ নিলো। যে দলটিকে প্রায় তিন দশক আগে নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ পদ ‘চেয়ারম্যান’ থেকেই সরিয়ে দেওয়া হলো তাকে। দলের নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন হাওড়ার প্রবীণ বিধায়ক অরূপ রায়।
তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে এত বড় এবং ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ঘটনা ঘটল।
সোমবার (২২ জুন) কলকাতার নিউটাউনের একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত তৃণমূলের এক বিশেষ ও জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রায় ৬০ জন বিধায়ক এবং কলকাতা পুরসভার অন্তত ৭০ জন কাউন্সিলর। এই বিশেষ বৈঠকের নেতৃত্বে ছিলেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
বৈঠকের শুরুতেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সাংগঠনিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি জানান, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর সর্বভারতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা বাধ্যতামূলক। সর্বশেষ ২০২২ সালে সেই কমিটি গঠিত হয়েছিল। এরপর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি তৈরি করা হয়নি। মূলত এই সাংবিধানিক শূন্যতা দূর করতেই জরুরি ভিত্তিতে এই বৈঠক ডাকা হয় বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।
এরপর দ্রুত গতিতে শুরু হয় সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। প্রথমে কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং পরবর্তীতে উপস্থিত সবার ধ্বনি ভোটে অরূপ রায়কে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
অরূপ রায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরপরই দলের নতুন রাজ্য নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের নাম ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটিতে স্থান পেয়েছেন: চেয়ারম্যান: অরূপ রায়, সহ-সভাপতি: ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ এবং সাবিনা ইয়াসমিন। সাধারণ সম্পাদক: ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান এবং সন্দীপন সাহা। কোষাধ্যক্ষ: আখরুজ্জামান আনসারি।
একই সঙ্গে দলের অতীতের সব আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ নিরীক্ষক (অডিটর) দল নিয়োগের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু সাধারণ কোনো নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, বরং তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে সম্পূর্ণ নতুন এক ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে ওঠার প্রকাশ্য ইঙ্গিত। রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই দলের অভ্যন্তরে যে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, এই বৈঠক তারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বিদ্রোহী তৃণমূল শিবির স্পষ্ট বার্তা দিল যে—তারা পুরনো নেতৃত্বের ছায়া থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়তে চায়। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত শিবিরের কাছে এই ঘটনা নিঃসন্দেহে এক মস্ত বড় ধাক্কা। এক সময় যার একক ক্যারিশমা ও নামে তৃণমূল কংগ্রেসের পরিচয় তৈরি হয়েছিল, রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতেই সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের দলেই নেতৃত্ব হারাতে হলো।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই ঐতিহাসিক রদবদল আগামী দিনে রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির মাঠ এবং তৃণমূলের অস্তিত্ব রক্ষায় কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

মন্তব্য করুন
মন্তব্য সমূহ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!