"পলাশী মানেই কিন্তু কেবল ভাগীরথী নদীর তীরের সেই পলাশী নয়; এখনও পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও বুড়িগঙ্গার তীরেও সেই পলাশীর চক্রান্ত চলমান। নামের মীর জাফর হয়তো নেই, কিন্তু একই চরিত্রের অসংখ্য মীর জাফর এই ভূখণ্ডে বসবাস করছে।"— বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এই মন্তব্য করেছেন।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বাইরের শত্রুর চেয়ে ঘরের শত্রুই বেশি ভয়ংকর। আর ক্ষমতার লোভে দেশ ও জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসই হলো পলাশীর ইতিহাস।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘পলাশী দিবসের তাৎপর্য ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। তবে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সৃষ্ট সেই ট্র্যাজেডি আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিঃশেষ করতে পারেনি; বরং সেখান থেকেই নতুন স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়, যা ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক যুগে আধিপত্যবাদ সরাসরি ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে নয়; বরং অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। তাই কেবল ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা নয়, বরং প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জামায়াত নেতা অভিযোগ করে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার নতুন প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষাকে নস্যাৎ করার চক্রান্ত চলছে।
সভাপতির বক্তব্যে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, পলাশী দিবসের আলোচনার সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাস বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে এবং বিভিন্ন সময়ে ঘষেটি বেগম, উমিচাঁদ ও রায়দুর্লভদের মতো চরিত্রের পুনরাবির্ভাব ঘটে, যারা ভেতর থেকে জাতিকে দুর্বল করে বিদেশি বা আধিপত্যবাদী শক্তির স্বার্থ রক্ষা করে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার 'মীরজাফরীয় চরিত্রের' পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যারা দেশের ভেতর থেকেই জন্ম নিয়ে জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ১৭৭০ সালের মন্বন্তরের (দুর্ভিক্ষ) প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে বাংলার জনগণ ভয়াবহ মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছিল। বর্তমান সময়েও সূর্যাস্ত আইন ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো শোষণমূলক কাঠামোর প্রতিচ্ছবি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিলক্ষিত হয়।
নূরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রশিবির একটি সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে, যারা জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহর সঞ্চালনায় সভায় অতিথি ও আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন, সালাহউদ্দিন আইউবী এমপি: সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, ছাত্রশিবির। ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ড. সায়ীদ ওয়াকিল: বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, সাহিত্য সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, প্রকাশনা সম্পাদক আমিরুল ইসলাম, শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পাদক আবু মুসা, বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন
মন্তব্য সমূহ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!