লেখক: দৈনিক প্রথম বেলা (আন্তর্জাতিক ডেস্ক)
ভারতের রাজস্থানের রাজধানী জয়পুরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রশস্ত করার কাজকে কেন্দ্র করে তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সড়কের সীমানার মধ্যে থাকা একাধিক মসজিদ ও মন্দির ভাঙার নোটিশ এবং উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুরো এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার পুলিশ সদস্য।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য সহিংসতা ও গুজব ছড়ানো রুখতে জয়পুর উত্তর ও জয়পুর পূর্ব পুলিশ জেলার ৩৪টি থানার আওতায় আগামী ২৪ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট, বাল্ক এসএমএস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যেকোনো ধরনের জমায়েত ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে আগামী ২২ জুন পর্যন্ত পুরো এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
জয়পুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (জেডিএ) এবং জেলা প্রশাসনের যৌথ এই উচ্ছেদ অভিযানটি চলছে জগতপুরা এলাকার নন্দপুরী আন্ডারপাসের কাছে। অভিযানস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজস্থান আর্মড কনস্ট্যাবুলারির (আরএসি) ১২টি কোম্পানিসহ অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
বর্তমানে পুরো নন্দপুরী এলাকাকে পুলিশ চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ড্রোন ক্যামেরার সাহায্যে সার্বক্ষণিক আকাশপথ থেকে নজরদারি চালানো হচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে উচ্ছেদ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগও সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।
মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, রেললাইনের সমান্তরালে থাকা প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি, যা বর্তমানে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ ফুট চওড়া, সেটিকে ৮০ ফুটে উন্নীত করার কাজ চলছে। আর এই সড়কের সীমানার মধ্যে থাকা মোট পাঁচটি ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি মসজিদ, একটি মাজার বা দরগাহ, দুটি মন্দির এবং একটি সৎসঙ্গ হল।
জেডিএর পক্ষ থেকে এর আগে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোকে নিজ উদ্যোগে স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর প্রশাসন সরাসরি বুলডোজার নিয়ে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে নূরানী মসজিদ উচ্ছেদকে ঘিরে। গত রবিবার রাতে মোতি দুঙ্গরি রোডের মুসাফিরখানায় মসজিদ কমিটি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা একটি দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে এই উচ্ছেদের তীব্র বিরোধিতা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কংগ্রেস বিধায়ক আমিন কাগজিকে আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, "আমরা নিজেদের হাতে মসজিদ ভাঙার সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমরা শুধু অনুরোধ করেছিলাম মসজিদের আকার ৪০ ফুট থেকে কমিয়ে ২০ ফুট করা হোক, যাতে নামাজ পড়ার জায়গা থাকে। কিন্তু প্রশাসন তাতে রাজি হয়নি।"
একই সভায় উপস্থিত আরেক কংগ্রেস বিধায়ক রফিক খান দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট মাজারটি দেশ স্বাধীন হওয়ার আগের এবং নূরানী মসজিদটি ১৯৮১ সালে নিজস্ব অর্থায়নে কেনা জমিতে নির্মিত হয়েছিল। তার দাবি, ১৯৯৪ সালে মসজিদের উন্নয়ন ফি-ও জেডিএতে জমা দেওয়া হয়। অথচ ২০০০ সালের পর যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই মাস্টারপ্ল্যানে রাস্তাটিকে ৮০ ফুট চওড়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি তারা আইনি পথেই মোকাবিলা করবেন বলে জানান।
প্রশাসনের যুক্তি, সংশ্লিষ্ট সড়কটি সরকারি নথিতেই ৮০ ফুট চওড়া হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। এই রাস্তাটি মালব্য নগর ও নন্দপুরী কলোনিকে জগতপুরা এবং প্রতাপ নগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। পাশাপাশি এটি জগতপুরা রেলওয়ে স্টেশন ও জয়পুর বিমানবন্দরে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ।
দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলের কারণে দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হতো। প্রশাসনের দাবি, উচ্ছেদ শেষে সড়কটি ৮০ ফুট চওড়া হলে দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং বিমানবন্দর ও রেলস্টেশনে যাতায়াতের জন্য একটি সহজ বিকল্প পথ উন্মুক্ত হবে।