প্রখ্যাত চিত্রনায়ক সালমান শাহর (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে এক নজিরবিহীন আদেশ দিয়েছেন আদালত। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তার দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং পুনরায় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকাই চলচ্চিত্রের তৎকালীন শীর্ষ তারকা সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। সে সময় তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন। তবে ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর: সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে সালমান শাহর মৃত্যুকে 'আত্মহত্যা' বলে উল্লেখ করে। ১৯৯৭ সালের ২৫ নভেম্বর: সিএমএম আদালত সিআইডির সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করে।পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ: সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমানের বাবা রিভিশন মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করে এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। ২১ অক্টোবর (গত বছর): আদালতের নির্দেশে রাজধানীর রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় দায়ের করা এই হত্যা মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে নামধারী আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়। নামধারী প্রধান আসামিরা হলেন: ১. সামীরা হক (সালমান শাহর স্ত্রী) ২. আজিজ মোহাম্মদ ভাই (শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক) ৩. লতিফা হক লুছি ৪. আশরাফুল হক ডন (চলচ্চিত্রের খলনায়ক) ৫. ডেবিট ৬. জাভেদ ৭. ফারুক ৮. রুবি (মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের মালিক) ৯. আব্দুস ছাত্তার ১০. সাজু ১১. রেজভি আহমেদ ফরহাদ
মামলার অভিযোগে বাদী মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মা নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ভাই শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমানের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে তাদের জানানো হয় সালমান ঘুমাচ্ছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা গত ২৪ মে এ আদেশ দেন। বুধবার (১০ জুন) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জিয়াউল মোর্শেদ।
এর আগে গত ২০ মে সিআইডির পক্ষ থেকে আদালতে এই আবেদনটি করা হয়েছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, আইনি কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের কাজ সম্পন্ন করা হবে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করে থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তারা মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন। সালমানের বাবার মৃত্যুর পর বর্তমানে তার মামা মোহাম্মদ আলমগীর বোনের (সালমানের মা নীলা চৌধুরী) পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রোডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু একটা হয়েছে। তারা দ্রুত বাসায় ফিরে দেখেন, শয়নকক্ষে সালমানের নিথর দেহ পড়ে রয়েছে এবং কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন।
সালমানের মা চিৎকার করে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ জানান। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তারা সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান। প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সালমান শাহকে মৃত ঘোষণা করেন এবং জানান যে, অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
দীর্ঘ তিন দশক পর আদালতের এই নতুন আদেশের ফলে সালমান শাহর মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে এক নতুন মোড় আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।