২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—ক্যালেন্ডারের পাতায় এটি কেবল একটি সাধারণ তারিখ নয়। আন্দোলনকারীদের ভাষায় এটি ‘৩৬ জুলাই’। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় দিন, যা একটি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের সফল সমাপ্তি এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রতীক।
২০২৪ সালের ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। ১৬ জুলাই আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় কয়েকজন নিহত হওয়ার পর তা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির মধ্য দিয়ে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। কোটা ব্যবস্থায় সংস্কার এলেও আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়।
আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দিয়েছিলেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কাছে জুলাই শেষ হবে না। সেই প্রতীকী অবস্থান থেকেই আগস্ট মাসের দিনগুলোকে জুলাইয়ের ধারাবাহিকতা হিসেবে গণনা করা শুরু হয়। সে অনুযায়ী, ১ আগস্টকে ‘৩১ জুলাই’, ৪ আগস্টকে ‘৩৪ জুলাই’ এবং ৫ আগস্টকে ‘৩৬ জুলাই’ নামে অভিহিত করা হয়। ঠিক এই দিনেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর প্রকাশ্যে আসে। আন্দোলনকারীদের মতে, ‘৩৬ জুলাই’ কেবল একটি প্রতীকী তারিখ নয়; এটি আত্মত্যাগের স্বীকৃতি এবং চূড়ান্ত বিজয়ের স্মারক।
দুই বছর আগের সেই দিনটির সকাল ছিল রক্তাক্ত ও থমথমে। কারফিউ ভেঙে জমায়েত হলে সর্বোচ্চ আইন প্রয়োগের হুঁশিয়ারি আগে থেকেই দিয়ে রেখেছিল তৎকালীন সরকার। সড়ক-মহাসড়কে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যুদ্ধংদেহী অবস্থান ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে সব শঙ্কা ও মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে সকাল থেকেই রাজপথে নামতে শুরু করেন বিপ্লবী জনতা। তাদের একট L াই লক্ষ্য ছিল—বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সফল করা এবং স্বৈরাচারের পতন ঘটানো। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও উত্তরাসহ ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ রাজধানীতে প্রবেশ করেন।
বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত হতে শুরু করলে পুলিশ গুলি চালিয়ে তা ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, রামপুরা ও বাড্ডায় আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে বেশ কয়েকজন নিহত হন এবং একপর্যায়ে ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সব বাধা ও ব্যারিকেড ভেঙে ছাত্র-জনতা গণভবনের দিকে এগোতে থাকেন। ওই সময় গণভবনে অবস্থান করছিলেন শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা। দুপুর ১২টার দিকে গণভবনের পথ থেকে সেনাসদস্যরা সরে যেতে শুরু করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
দুপুর আড়াইটার দিকে আইএসপিআরের বরাਤੇ গণমাধ্যমে জানানো হয়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দুপুর ২টায় জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন; ততক্ষণে সবাইকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানানো হয়। এ খবরে নিশ্চিত হয়ে যায় যে প্রধানমন্ত্রীর পদে শেখ হাসিনা আর থাকছেন না। এরপর লাখো মানুষ শাহবাগসহ নগরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে গণভবনের দিকে ছুটতে শুরু করেন।
দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে ভারতের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ঠিক একই সময়ে ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় এবং সুধা সদন থেকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় লোকজন সরে পড়েন। ইন্টারনেটহীন অবস্থায় অবসান ঘটে দীর্ঘ শাসনের।
বিকাল ৪টায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের খবর নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করা হবে।
সেনাপ্রধানের ঘোষণার আগেই শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়েন সাধারণ মানুষ। ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে বের হয় আনন্দ মিছিল। শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, দিনমজুর, রিকশাচালক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ লাল কাপড় মাথায় বেঁধে ও জাতীয় পতাকা হাতে এই বিজয়ের আনন্দে শামিল হন। পরাধীনতার শিকল ভেঙে নতুন এক স্বাধীনতা অর্জনের অনাবিল আনন্দে বুকভরে শ্বাস নেন দেশের মানুষ।