‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হচ্ছে জামায়াতের এমপি গাজী নজরুল ইসলাম। জামায়াত নেতার রগরগে ফুটেজে যখন সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাব—তখন হুট করেই ‘প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন’র ছুটিতে যাওয়ার গুঞ্জন। চট করেই বদলে গেলো সোশ্যাল মিডিয়ার কন্টেন্ট। একটি বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত কথিত প্রবাসী সাংবাদিকের ফেসবুক স্ট্যাটাসই সব গুঞ্জন-গুজবের উৎস।
এই ভদ্রলোক হাদী হত্যাকারীর নির্বিঘ্নে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ‘রিয়েলটাইম আপডেট’ দিয়ে সমালোচিত হওয়ার পর কিছুদিন গুজব রটানো থেকে নিবৃত ছিলেন।
বুধবার দেয়া তার এক স্ট্যাটের পর ঘুরে যায় ফোকাল পয়েন্ট। এমন সময় গুঞ্জনটি ছড়ানো হয়—যখন জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলাম এমপিকে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে বহিষ্কার সংক্রান্ত বৈঠক চলছে। ফলে সারাদেশে ঢি ঢি পড়ে যাওয়া গাজী নজরুলের তাজা ইস্যুটি বিস্মৃত হতে শুরু করে।
তথ্যশূন্য মিডিয়াগুলো ‘চিলে কান নিয়ে গেছে’র মতো হামলে পড়ে ‘প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন বিদায় নিচ্ছেন’ মর্মে গুঞ্জনের পিছু। ছোট ইস্যু দিয়ে বড় ইস্যু চাপা দেয়া পুরনো কৌশল। হাসিনাও এমনটি করতেন। একটি ইস্যু অদৃশ্য করে দিতে হাসিনা বিশেষ বাহিনীকে দিয়ে ধাম করে আরেক ইস্যুর অবতারণা করতেন। মানুষের সাইকোলজি নিয়ে খেলতেন তিনি। সেই ট্রেন্ড ফের শুরু হলো কি না—সেই প্রশ্ন এখন বিশ্লেষকদের।
জামায়াত নেতা গাজী নজরুলের ‘নৈতিক স্খলন’ হয়েছে। এমনটি ‘প্রমাণিত’ হওয়ায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত জানিয়ে জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। গত বুধবার দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি সভায় গৃহীত এ সিদ্ধান্তের কথা নির্বাচন কমিশনকে গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়ে দিয়েছে। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্বাক্ষরিত পত্রে দেয়া ওই পত্রে বলা হয়, জনাব গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি আপনার (সিইসি) অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দাখিল করা হলো।
বুধবার বিকেল নাগাদ জামায়াত নেতার কাণ্ড ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্লেষক মহলে প্রশ্ন দেখা দেয়, তাহলে কি জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলাম এমপি পদ হারাতে বসেছেন? প্রশ্নটি মোটা দাগের। এটিই হওয়ার কথা। আপাত দৃষ্টিতে তার এমপি পদ চলে যাওয়াই উচিত। কিন্তু সংবিধান, সংসদীয় কার্যপ্রণালী ও রীতি-রেওয়াজ বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা।
সংবিধানে ‘আইনসভা’ বা ‘সংসদ’ সংক্রান্ত ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদে এমপি নির্বাচিত হওয়ার ‘যোগ্যতা’ ও ‘অযোগ্যতা’ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। ৬৬(২)-এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি— (ক) কোন উপযুক্ত আদালত কর্তৃক তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলিয়া ঘোষণা করেন, (খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হইবার পর দায় হইতে অব্যাহতি লাভ না করিয়া থাকেন, (গ) তিনি কোন বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন, (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যুন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসর যাবতকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে, (ঙ) তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন কোন অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইয়া থাকেন, (চ) আইনের দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করিতেছে না, এমন পদ ব্যতিত তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে অনুষ্ঠিত থাকেন, অথবা (ছ) তিনি কোনো আইনের দ্বারা বা অধীন অনুরূপ নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হন।
সংবিধানের এসব অনুচ্ছেদ এবং উপ-অনুচ্ছেদের অধিকাংশ ধারার মধ্যেই জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়টি পড়ে না। কিন্তু ৬৬(২)(ঘ) উপ-অনুচ্ছেদে তিনি ‘নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধ’ তাকে স্পর্শ করেছে বটে। সে হিসেবে জামায়াত নেতাকে নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, গাজী নজরুল ইসলাম নিজ দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারায় দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’-এর প্রমাণ পেয়েছে মর্মে জানানো হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা যায়নি। নারীঘটিত যে ঘটনার কারণে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট নারীর পরিবারের পক্ষ থেকে কিংবা গাজী নজরুল ইসলামের নিজ পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। অর্থাৎ সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এখন পর্যন্ত যে অর্থ দাঁড়ায় তাতে গাজী নজরুলের এমপি পদ চলে যাওয়ার মতো প্রেক্ষাপট সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এখনো তৈরি হয়নি।
এখন দেখা যাক, ‘আইনসভা’ সংক্রান্ত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কী বলে। বহুল আলোচিত এই অনুচ্ছেদটি রাজনৈতিক দল থেকে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া সংক্রান্ত। ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোন নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি— (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।
এটির উপ-অনুচ্ছেদে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াত থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি। জাতীয় সংসদে দলের বিপক্ষে কোনো ভোটও দেননি। তাকে বরং ‘নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায়’ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফৌজদারি কোনো মামলা দায়ের হয়নি। মামলায় দণ্ডিতও হননি। সেই বিচারে ৭০ অনুচ্ছেদও জামায়াত নেতার এমপি পদ হারানোর জন্য উপযুক্ত কারণ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দল থেকে বহিষ্কার হওয়াও এমপি পদ হারানোর কোনো প্রেক্ষাপট নয়। এ ধরনের গ্রাউন্ডে এ পর্যন্ত কেউ এমপি পদ হারাননি। তবে দল যদি তাকে ‘ওন’ না করে তাহলেও তিনি স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে পরিগণিত হতে পারেন। আবার কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, বর্তমান বিধান ও আইনে দলীয়ভাবে নির্বাচিত এমপি নিজ দল থেকে বহিষ্কৃত হলে কোনোক্রমে তার এমপি পদও খারিজ হয়ে যাবে।
নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামায়াত তার দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পিকার কিংবা নির্বাচন কমিশনের কাছে জানালে গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ শূন্য হবে।
গত ৫৫ বছরের সংসদীয় ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণে কারো এমপি পদ যায়নি। অষ্টম জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। সরকারদলীয় এমপি আবু হেনাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলেও তার এমপি পদ টিকে ছিল। স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে তিনি সংসদের মেয়াদ পূর্ণ করেন। কারণ আবু হেনা সংসদের ভেতর এবং বাইরে নিজ দলের সমালোচনা করলেও সংসদের ভেতর ভোটাভুটিতে তিনি দলের বিপক্ষে অবস্থান নেননি। এটি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন বলেও বিবেচিত হয়নি।
জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলাম তো সংসদের ভেতরে-বাইরে দলের পক্ষেই কথা বলছিলেন। ভোটাভুটিতেও দলের বিপক্ষে অবস্থান নেননি। তবে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ-১৯৭২ অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি পদে নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আগেই ঘোষণা দিতে হয়। নির্বাচন করতে তার জন্য নির্বাচনী আসনের অন্তত ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর লাগে। যা ২০০১ সালের আরপিওতে বাধ্যতামূলক ছিল না। এটি পরবর্তীতে বাধ্যতামূলক করা হয়। সে ক্ষেত্রে ‘স্বতন্ত্র এমপি’ হিসেবেই বা কী করে গাজী নজরুলের এমপি পদ বহাল থাকবে—সেটি আরেকটি প্রশ্ন।
আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত এমপি লতিফ সিদ্দিকীকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদের এমপি হিসেবে তিনি থেকে যান। এ নিয়ে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়। সেই জটিলতা কয়েক বছর ধরে চলে। কিন্তু এরই মাঝে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকী জাতীয় সংসদের ভেতর দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিয়েই স্বেচ্ছায় এমপি পদ ছেড়ে দেন। দল কিংবা সংসদ তার এমপি পদ কেড়ে নিতে পারেনি।
গাজী নজরুলের আসন থেকেই জাতীয় পার্টির টিকিটে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন এম. গোলাম রেজা। জাপা তাকেও বহিষ্কার করেছিল। কিন্তু তার এমপি পদ বহাল ছিল।
সপ্তম জাতীয় সংসদে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন সিরাজগঞ্জ-৭ আসনের হাসিবুর রহমান স্বপন। বিএনপি তখন সংসদের বিরোধী দল। এ অবস্থায় তিনি তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের উপমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। পরে বিএনপি তাকে বহিষ্কার করে। এ নিয়ে তখন আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালত ১৯৯৮ সালে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের দায়ে হাসিবুর রহমান স্বপনের এমপি পদ অবৈধ ঘোষণা করেন।
পক্ষে-বিপক্ষে এমন বেশ কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে এমপি পদ থাকা-না থাকা ইস্যুতে। নারী কেলেঙ্কারির দায়ে দল থেকে বহিষ্কৃত জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ থাকছে কি না—সেটি পরিষ্কার হতে হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।