সুদ কী? ইসলামের দৃষ্টিতে সুদী ব্যাংকে লেনদেনের হুকুম

✍️মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকী।

ভূমিকা: সুদ একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে এ কুপ্রথা চালু হওয়ায় এক শ্রেণির মানুষ রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। অন্যদিকে এ কুপ্রথার প্রভাবে নিঃস্ব মানুষগুলো হচ্ছে আরো নিঃস্ব। বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কৌশলে এ প্রথা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। এসব ব্যাংকে লেনদেনের ব্যাপারে ইসলামি শরীয়তে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে।

★আভিধানিক অর্থ:

১. আল কামূসুল ফিকহী গ্রন্থকার বলেন, তথা অতিরিক্ত হওয়া।

২. আল মুজামুল ওয়াসীত প্রণেতার মতে, এর অর্থ অতিরিক্ত হওয়া ও বৃদ্ধি পাওয়া। পবিত্র কুরআনে এ অর্থে শব্দটির প্রয়োগ এভাবে এসেছে,

وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءِ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ أَيْ زَادَتْ

৩. কাওয়ায়েদুল ফিকহ প্রণেতার মতে, اَزيَادَةُ তথা আধিক্য, বৃদ্ধি পাওয়া। যেমন هذَا يَرْبُو عَلَى ذَلِكَ . বলা হয়,

৪. তথা উঁচু হওয়া।তথা বৃদ্ধি হওয়া।

৫. এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো, Interest, Premium for the use of money ইত্যাদি।

★পারিভাষিক সংজ্ঞা:

১. মহানবী (স) ইরশাদ করেন,

كُلُّ قَرْضِ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا
অর্থাৎ, যে ঋণ কোনো মুনাফা টেনে আনে তাই সুদ।

২. আল্লামা ইবনুল আসীর (র)-এর মতে,

الربا في الشرع هُوَ الزِيَادَةُ عَلَى أَصْلِ الْمَالِ مِنْ غَيْرِ عَقْدِ تَبَايُع .

অর্থাৎ, আকদের বাইরে মূল মূলধনের অতিরিক্ত অংশকে তথা সুদ বলা হয়।

যেমন- এক মণ ধানের পরিবর্তে এক মণ দশ কেজি ধান গ্রহণ করা।

৩. আল মুজামুল ওয়াসীত অভিধান প্রণেতার মতে,

الرِّيَا فِي الشَّرْعِ. هُوَ فَضْلُ مَالٍ مِنْ عِوَض شُرِطَ لِأَحَدٍ الْمُتَعَاقِدَيْنِ .

৪. মুফতি আমীমুল ইহসান (র)-এর মতে,

هُوَ فَضْلٌ خَالٍ عَنْ عِوَضٍ بِمِعْبَارٍ شَرْعِي مَشْرُوطٍ لِأَحَلَمِ الْمُتَعَاقِدَيْنِ فِي الْمُعَاوَضَةِ.

সুতরাং, একই জাতীয় মালের বিনিময়ে অতিরিক্ত অংশ গ্রহণকে সুদ বলে।

★সুদ সম্পর্কে ইসলামের বিধান…

সুদ শোষণের অন্যতম হাতিয়ার। এজন্য ইসলাম সুদকে হারাম ঘোষণা করেছে। সুদপ্রথা অর্থসম্পদকে সমাজের মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে কুক্ষিগত করে রাখে। ফলে সমাজে নানা রকম অপকর্ম ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এজন্য একে হারাম ঘোষণা করে মহান আল্লাহ বলেন,

أَحَلَ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبوا

অর্থাৎ, আল্লাহ ব্যবসাকে করেছেন হালাল আর সুদকে করেছেন হারাম।

তিনি আরো বলেন,

يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ.
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! যেটুকু সুদ অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা
মুমিন হও। যদি তা না কর তবে আল্লাহ ও রাসূল (স)-এর বিপক্ষে যুদ্ধের ঘোষণা দাও।

হযরত জাবের (রা) থেকে বর্ণিত, মহানবী (স) সুদ গ্রহীতা, দাতা, সাক্ষী ও লেখকের উপর লা’নত করেছেন, এবং তিনি বলেছেন, এরা সকলেই সমান” (বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযী)।

বাহ্যিক দৃষ্টিতে সুদ সম্পদ বৃদ্ধি করে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সম্পদ বৃদ্ধি করে না; বরং তা সম্পদ ধ্বংস হওয়ার কারণ।

★সুদী ব্যাংকে লেনদেনের বিধান…

ব্যাংকের সাথে লেনদেনের সাধারণ দুটি পদ্ধতি
রয়েছে।
যথা- ১. আমানত রাখা,২. ঋণ গ্রহণ করা।

১. সুদী ব্যাংকে আমানত রাখার হুকুম: সকল আলেমের ঐকমত্যে সুদ গ্রহণের শর্তে
সুদী ব্যাংকে টাকা আমানত রাখা ও বিনিয়োগ করা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ। তবে সুদ গ্রহণ না করার শর্তে টাকার নিরাপত্তা বিধানের জন্য আমানত রাখা জায়েয আছে।

২ . সুদী ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের হুকুম: সকল ইমামের ঐকমত্যে সুদ প্রদানের

শর্তে সুদী ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে হারাম। তার কারণ হলো-

১. মহান আল্লাহর বাণী,

أَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبوا .

فاذنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللهِ وَرَسُولِه .

الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبوا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ
الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِ .

وَذَرُوا مَا بَقِي مِنَ الرِّبوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ .

২. রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

مَنْ أَخَذَ الرِّبوا وَاعْطَى الرِّبوا كِلَاهُمَا مُسْتَوِيَانِ فِي الذَّنْبِ.

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ (ص) أَكِلَ الرِّبوا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَةً وَشَاهِدَيْهِ.

الرِّبوا سَبْعُونَ جُزْءًا يُسْرُهَا أَنْ يَنْكِحَ الرَّجُلُ الله .

®তবে কেউ যদি সুদী ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণে বাধ্য হয়ে পড়ে এবং তার জন্য ঋণ গ্রহণের অন্য কোনো পথ না থাকে তাহলে শুধু তার জন্য সুদী ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করা জায়েয আছে। এক্ষেত্রে আল্লাহ বলেছেন,

فَمَنِ اضْطُرَ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفِ لِاثْمٍ
উল্লেখ্য, সুদী ব্যাংকের সাথে লেনদেন হারাম হলেও বর্তমানে প্রচলিত ইসলামী শরীয়া মোতাবেক পরিচালিত কিছু ব্যাংকের সাথে যাবতীয় লেনদেন জায়েয আছে।

কারণ তারা,
بيع مُشَارَكَةً و بَيْعِ مُضَارَبَةٌ .

এর ভিত্তিতে সকল লেনদেন পরিচালনা করে বলে এতে সুদের কোনো অস্তিত্ব নেই, তাই এটা জায়েয।

★সুদের কুফল সমূহ…

১.সুদভিত্তিক লেনদেন মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহানুভূতি হ্রাস করে।
এতে অনেক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

২.ধনীদের মাঝে সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। ফলে ধনী আরো ধনী হতে থাকে আর গরিব ক্রমান্বয়ে নিঃস্ব হতে থাকে।

৩.সুদভিত্তিক ঋণে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হ্রাস পায়।

৪.সুদসহ ঋণ পরিশোধ করতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সর্বস্ব হারাতে হয়।

৫.জাতীয় উৎপাদন ও কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়।

৬.সুদের চাকায় পিষ্ট হয়ে গরিব ক্রমান্বয়ে গরিব হতে থাকে।

৭.বেকারত্ব বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়।

৮.দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়, এতে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়।

★পরিশেষে বলবো…

ইসলামী শরীয়ার দৃষ্টিতে সুদ খাওয়া, সুদ দেওয়া এবং এর লেনদেনে সহযোগিতা করা সবই হারাম এবং অভিসম্পাতযোগ্য অপরাধ। এজন্য দুনিয়াবি কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির জন্য সুদ পরিহার করে ইসলামি অর্থনীতি চালু করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা উচিত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button