চেষ্টা থাকলেই ঠেকানো যায় প্রায় অর্ধেক ক্যান্সার

নিজস্ব  প্রতিবেদক: 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং এর সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) নতুন এক বৈশ্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই গবেষণায় ক্যান্সার সৃষ্টির ৩০টি প্রতিরোধযোগ্য কারণ খতিয়ে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তামাক ও অ্যালকোহল সেবন, অতিরিক্ত শারীরিক ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণ, অতিবেগুনি রশ্মি এবং প্রথমবারের মতো ক্যান্সার সৃষ্টিকারী নয়টি সংক্রমণের বিষয়।

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী নতুন করে প্রায় ৭ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। গবেষণা বলছে, এই রোগীদের বড় একটি অংশের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যেত। তবু ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে না আসায় ক্যান্সারের বোঝা কমছে না, বরং বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই গবেষণা ১৮৫টি দেশ এবং ৩৬ ধরনের ক্যান্সারের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী নতুন ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রধান কারণ ছিল তামাক ব্যবহার। অ্যালকোহল দায়ী ছিল আরও ৪ শতাংশ ক্যান্সারের জন্য। এর বাইরে রয়েছে বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত ওজন এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো ঝুঁকি। এগুলো সবই নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের প্রায় অর্ধেকই আসে মাত্র তিন ধরনের ক্যান্সার থেকে। এগুলো হলো— ফুসফুসের ক্যান্সার, পাকস্থলীর ক্যান্সার এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সার। ফুসফুসের ক্যান্সার সরাসরি ধূমপান ও বায়ুদূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাকস্থলীর ক্যান্সার হয় মূলত হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে। আর জরায়ুমুখের ক্যান্সার ছড়ায় হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভি সংক্রমণের মাধ্যমে। এই তিন ক্ষেত্রেই প্রতিরোধের উপায় জানা আছে।

এই বাস্তবতার মানবিক চিত্র উঠে আসে রোগীদের গল্পে। ঢাকার উপকণ্ঠে বসবাসকারী ৫৫ বছর বয়সী আবদুল করিম দীর্ঘদিন পোশাক কারখানায় কাজ করেছেন। দিনে এক প্যাকেটের বেশি সিগারেট খাওয়াটা ছিল তার দৈনন্দিন অভ্যাস। কর্মস্থলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছিল দুর্বল। বাইরেও ছিল দূষিত পরিবেশ। শ্বাসকষ্ট শুরু হলেও তিনি গুরুত্ব দেননি। আবদুল করিম বলেন, “সিগারেটটা ছাড়বো ছাড়বো করেও ছাড়তে পারিনি। কাজের জায়গায় ধুলা আর ধোঁয়া ছিল, কিন্তু তখন মনে হতো এটাই তো জীবন। এখন ডাক্তার বলছেন, এই অভ্যাসই আমাকে ক্যান্সারের দিকে নিয়ে গেছে।”

পরে কাশি ও রক্ত যাওয়ার পর পরীক্ষা করে ধরা পড়ে ফুসফুসের ক্যান্সার। চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘদিনের ধূমপান এবং দূষিত পরিবেশই এর প্রধান কারণ। করিম এখন চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, “আগে জানলে, বুঝলে হয়তো নিজেকে বাঁচাতে পারতাম। এখন মনে হয়, এই রোগটা আসলে অনিবার্য ছিল না।”

একইভাবে প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী শারমিন আক্তার। তিনি গ্রাম থেকে শহরে এসে একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন। জরায়ুমুখের ক্যান্সার বা এইচপিভি টিকা সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোও হয়নি। শারমিন আক্তার বলেন, “কখনো ভাবিনি এমন রোগ হতে পারে। ব্যথা আর সমস্যা শুরু হলেও লজ্জা আর ভয় থেকে কাউকে বলিনি। পরে যখন হাসপাতালে গেলাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।”

পরীক্ষার পর ধরা পড়ে জরায়ুমুখের ক্যান্সার। চিকিৎসকরা জানান, সময়মতো এইচপিভি টিকা এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং থাকলে এই ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। শারমিন বলেন, “ডাক্তাররা বললেন, আগেই ধরা পড়লে এই রোগ হতো না। তখন খুব কষ্ট লেগেছে। মনে হয়েছে, অজানার কারণে আমি নিজের সর্বনাশ করেছি।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের হার বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রে নতুন ক্যান্সারের প্রায় ৪৫ শতাংশই প্রতিরোধযোগ্য। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ। পুরুষদের মধ্যে ধূমপান সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। নারীদের ক্ষেত্রে ভাইরাল সংক্রমণ এবং অতিরিক্ত ওজন বড় ভূমিকা রাখছে।

অঞ্চলভেদেও চিত্র আলাদা। কোথাও বায়ুদূষণ বড় সমস্যা। কোথাও সংক্রমণ। কোথাও আবার জীবনযাপনের ধরনই প্রধান ঝুঁকি। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের হার তুলনামূলক বেশি। কারণ সেখানে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও দুর্বল।

বাংলাদেশে ক্যান্সারের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ধূমপান
বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশে এখনো সরকারি পর্যায়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার রেজিস্ট্রি নেই। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফরুক বলেন, সীমিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ লাখ। এই সংখ্যা বাড়ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ক্যান্সারের বড় কারণগুলোর মধ্যে ধূমপান অন্যতম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বায়ুদূষণ, ভেজাল খাদ্য, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি। এসব কারণের বেশিরভাগই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

তার মতে, দেশে ক্যান্সার মোকাবিলায় চিকিৎসার ওপর জোর বেশি দেওয়া হচ্ছে। প্রতিরোধে গুরুত্ব কম। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এইচপিভি টিকা ও স্ক্রিনিং কর্মসূচিও সীমিত।

আইএআরসি’র ক্যান্সার নজরদারি ইউনিটের উপ-প্রধান ড. ইসাবেল সোয়েরজোমাতারাম বলেন, এই গবেষণা প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের সবচেয়ে বিস্তৃত মূল্যায়ন। তার মতে, আচরণগত, পরিবেশগত ও সংক্রামক ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করতে পারলেই ক্যান্সারের বোঝা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যান্সার প্রতিরোধ শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়। এটি শিক্ষা, পরিবহন, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ ও শ্রমনীতির সঙ্গেও জড়িত। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সুযোগ না থাকলে ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে ক্যান্সার ঠেকানো কঠিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button