ওয়াজ মাহফিল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা

অ্যাক্টিভিষ্ট| লেখক| গবেষক: মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকী।

★প্রারম্ভ… ওয়াজ-মাহফিল অর্থ:
‘ওয়াজ’ (وعظ) আরবী শব্দ। এর অর্থ উপদেশ, নছীহত, বক্তব্য। যেমন-وعظ: الْوَعْظُ وَالْعِظَةُ وَالْعَظَةُ وَالْمَوْعِظَةُ: النُّصْحُ وَالتَّذْكِيرُ بِالْعَوَاقِبِ
(লিসানুল মীযান,৭/৪৬৬ পৃ.)।

আল্লাহ ইরশাদ করেন…

ادْعُ إِلَى سَبيلِ رَبِّكَ بالحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ

অনুবাদ:‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে’ (নাহল ১৬/১২৫)।

আলোচ্য আয়াতে ‘দাওয়াহ ইলাল্লাহ’র মাধ্যম হিসাবে আল্লাহ ‘ওয়াজ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। লোকমান(আ:)কর্তৃক স্বীয় সন্তানকে প্রদত্ত উপদেশকে আল্লাহ ‘ওয়াজ’ বলেছেন।

যেমন তিনি বলেন…
,وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَابُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيْمٌ،

অনুবাদ:‘আর স্মরণ কর, যখন লোকমান তার পুত্রকে ওয়াজ (উপদেশ) করতে গিয়ে বলল, ‘হে বৎস! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শিরক সবচেয়ে বড় পাপ’।
(সূরা,লোকমান ৩১/১৩)

অনুরূপভাবে অবাধ্য স্ত্রীদের উপদেশ দানের ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ

অনুবাদ:‘আর যদি তোমরা তাদের
অবাধ্যতার আশংকা কর, তাহ’লে তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের বিছানা পৃথক করে দাও এবং (প্রয়োজনে) তাদের প্রহার কর’ (নিসা ৪/৩৪)।

আর ‘মাহফিল’ (محفل) শব্দটি حفل শব্দ থেকে নির্গত। এটি একবচন। বহুবচনে محافل এর অর্থ হচ্ছে مَكَان الِاجْتِمَاع والمجلس ‘সভা ও সমাবেশের স্থান’ (মু‘জামুল ওয়াসীত্ব)।

যে সভা-সমাবেশে ওলামায়ে কেরাম ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে উপদেশ বা নছীহত পেশ করেন সে সমাবেশকে ওয়াজ-মাহফিল বলা হয়।

★গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা…
দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকা একটি মর্যাদাপূর্ণ কাজ। এই পথের দাঈদের কথাকে আল্লাহ সর্বাধিক সুন্দর বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ،

অনুবাদ:‘ঐ ব্যক্তির চাইতে কথায় উত্তম আর কে আছে, যে (মানুষকে) আল্লাহর দিকে ডাকে ও নিজে সৎকর্ম করে এবং বলে যে, নিশ্চয়ই আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত’।
(হামীম সাজদা ৪১/৩৩)।

নবী-রাসূলগণের মিশন ছিল আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকা ও তাগূত্ব থেকে বিরত রাখা। আল্লাহ বলেন,

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ،

অনুবাদ:‘প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট আমরা রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং ত্বাগূত থেকে দূরে থাক’ (নাহল ১৬/৩৬)।

শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা:) এবং তাঁর সাহাবীগণ শত প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দাওয়াতী ময়দানে অবিচল ছিলেন। আল্লাহ বলেন,

قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ

অনুবাদ:‘বলুন! এটাই আমার পথ। আমি ও আমার অনুসারীগণ ডাকি আল্লাহর দিকে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে। আল্লাহ পবিত্র। আর আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই’ (ইউসুফ:১২/১০৮)।

অর্থাৎ রাসূল (সা:) ও সাহাবীগণ সকলে দাঈ ইলাল্লাহ ছিলেন। জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে অহীর আলোয় আলোকিত করার জন্য তারা নিরন্তরভাবে দাওয়াতী কাজ করে গেছেন এবং উম্মাতে মুহাম্মাদীর উপর এই গুরু দায়িত্ব অর্পণ করে গেছেন। ওয়াজ-মাহফিল সেই দাওয়াতেরই একটি অন্যতম মাধ্যম। মানবসমাজের উন্নতি ও সংশোধনের জন্য এটি অতুলনীয় পন্থা। এর মাধ্যমে জনগণকে একত্রিত করে আল্লাহর দিকে আহবান জানানোর সুযোগ তৈরি হয়।

এদেশে যুগ যুগ ধরে শীত মৌসুমে ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন হয়ে থাকে। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারী প্রায় পাঁচ মাসব্যাপী দেশের আনাচে-কানাচে এই উৎসবমুখর আয়োজন চলে। দূর-দূরান্তের নামী-দামী আলেম-ওলামাগণ বিভিন্ন বিষয়ের উপর দীর্ঘ সময় যাবত নছীহত করেন। এতে মানুষের মধ্যে দ্বীনি জাযবা তৈরী হয় এবং ইসলামের বিধান পালনে কিছু মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে। অনেকে হালাল গ্রহণ ও হারাম বর্জনে দৃঢ় প্রত্যয়ী হন। এভাবে ক্রমান্বয়ে সমাজে দ্বীনি আবহ সৃষ্টি হয়।

নিকট অতীতে গ্রামে-গঞ্জে যেভানে নাচ-গান-যাত্রা ইত্যাদি অশালীন অনুষ্ঠানের আয়োজন হ’ত ইদানীং তা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এমনকি এলাকা বিশেষে একেবারে উঠে গেছে। সে জায়গাটা দখল করেছে ওয়ায-মাহফিলের মত ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো। যারা এক সময় পালাগানের আসর বসাতো তারাই এখন ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়ে দ্বীনী অনুষ্ঠান আয়োজনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। সুতরাং কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি সমাজকে সংস্কার করতে ওয়ায-মাহফিল, দাওয়াতী সভা-সমাবেশ, ইসলামী জালসা-সম্মেলন, ইত্যাদি প্রকাশ্য ধর্মীয় জনসমাবেশের গুরুত্ব অপরিসীম।

★ওয়াজ-মাহফিলের হালচিত্র…
ওয়াজ-মাহফিলের ব্যাপক প্রসারের পাশাপাশি হালে কিছু কিছু কারণে এর নেতিবাচক প্রভাবও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একশ্রেণীর দ্বীন জ্ঞানহীন আলোচকের কারণে ওয়াজের মঞ্চকে অনেকে বিনোদন মঞ্চ হিসাবেও আখ্যা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আবার অনেকে রাজনৈতিক স্বার্থে এই মঞ্চ ব্যবহার করছে। অনেক আলোচক মিথ্যা বানাওয়াট কিচ্ছা-কাহিনীর মাধ্যমে, কেউ যিকরের নামে গর্হিত লাফালাফি ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে, কেউ পারস্পরিক অশ্রাব্য গালাগালি ও গীবত-তোহমদের মাধ্যমে এই মঞ্চটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দ্বীনের আলো বিতরণের এই মঞ্চটি যেন পাঁচমিশালী মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এ সম্পর্কিত কতিপয় আপত্তিকর বিষয় এখানে তুলে ধরা হ’ল, যেগুলো থেকে ওয়াজ মাহফিলকে নিরাপদ রাখা খুবই জরূরী।-

★উদ্ভট কিচ্ছা-কাহিনী পরিবেশন…
দেশের নামী-দামী অনেক আলোচক আছেন, যাদের আলোচনায় কুরআন-হাদীসের চাইতে বানাওয়াট কিচ্ছা-কাহিনীই বেশী শুনা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তব্য দিলেও এদের কারো কারো মুখ থেকে কুরআন-হাদীস তেমন শুনা যায় না।

আবার কেউ জাল-যঈফ হাদীস ও ভিত্তিহীন কথা দ্বারা ওয়াহ করেন। নিজেদের আচরিত মাযহাব, মতবাদ ও তরীকার বিপক্ষে সহীহ হাদীস জানলেও তারা বলেন না। রাসূল (সা:)-এর নামে বানানো জাল বা মিথ্যা হাদীস দ্বারা দ্বীন প্রচার করছেন। পরিণামে তারা নিজেদের আখেরাত বিনষ্ট করছেন। রাসূল (সা:) বলেন,

لاَ تَكْذِبُوْا عَلَىَّ فَإِنَّهُ مَنْ كَذَبَ عَلَىَّ فَلْيَلِجِ النَّارَ،

অনুবাদ:‘তোমরা আমার উপর মিথ্যারোপ কর না। কেননা যে ব্যক্তি আমার উপর মিথ্যারোপ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।

অন্যত্র তিনি বলেন,

مَنْ كَذَبَ عَلَىَّ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ،

অনুবাদ:‘যে ব্যক্তি আমার উপরে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়’।

সে কারণে বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। যিনি প্রকৃতপক্ষে কুরআন-হাদীসের জ্ঞান রাখেন এবং দলীলভিত্তিক কথা বলেন কেবলমাত্র সেই আলেমকেই দাওয়াত দেওয়া উচিত।

★আলোচকদের অঙ্গভঙ্গি ও অশালীন ভাষা প্রয়োগ…
কোন কোন আলোচকের অঙ্গভঙ্গি ও ভাষা প্রয়োগ খুবই আপত্তিজনক। সিনেমার অভিনেতা ও গায়ক-গায়িকাদের নকল করে তারা শ্রোতাদের মাত করে রাখেন। অর্থহীন ও অশালীন সঙ্গীত পরিবেশন করেন, লজ্জাকর অঙ্গভঙ্গি করেন। দৃশ্যত মনে হয় যেন এটা কোন ওয়াযের মঞ্চ নয়, বরং কোন নাট্যমঞ্চ। কুরআনের ভাষায় এরা ‘লাহওয়াল হাদীস’ বা বাজে কথা খরীদকারী। আল্লাহ বলেন…

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِيْنٌ،

অনুবাদ:‘লোকদের মধ্যে কেউ কেউ আছে, তারা তাদের অজ্ঞতাবশে বাজে কথা খরিদ করে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুৎ করার জন্য এবং তারা আল্লাহর পথকে বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে হীনকর শাস্তি’ (সূরা:লোকমান ৩১/৬)।

এখানে ‘বাজে কথা’ অর্থ গান-বাজনা। যা মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিমুখ করে। রাসূলুল্লাহ (সা:) স্বীয় উম্মতকে সাবধান করে বলেন,

نَهَيْتُ عَنْ صَوْتَيْنِ أَحْمَقَيْنِ فَاجِرَيْنِ صَوْتٍ عِنْدَ مُصِيبَةٍ خَمْشِ وُجُوهٍ وَشَقِّ جُيُوبٍ وَرَنَّةِ شَيْطَانٍ-

অনুবাদ:‘দু’টি অভিশপ্ত ও পাপিষ্ঠ শব্দ থেকে আমি তোমাদের নিষেধ করে যাচ্ছি। (১) বাজনার শব্দ ও নাচ-গানের সময় শয়তানের সুরধ্বনি (২) বিপদের সময় মুখ ও বুক চাপড়ানোর ক্রন্দন ধ্বনি’।[6] সুতরাং কুরআন হাদীছ বাদ দিয়ে এসব অভিনয়, সংগীত ও কমেডি আলোচনা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে সন্দেহ নেই। তাই অন্তসারশূন্য এসমস্ত আলোচনা থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে ফিরে আসা উচিত।

★রাজনৈতিক প্রচারণার ক্ষেত্র ওয়ায-মাহফিল…
গ্রাম-গঞ্জের ওয়াজ-মাহফিল আজকাল রাজনৈতিক নেতাদের প্রচারণার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার ও দলীয় নেতারা অথবা সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাহফিলগুলোকে তাদের দলীয় প্রচারণার কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। এমনকি এরা এতটাই প্রভাব বিস্তার করে যে, বক্তৃতা চলাবস্থায় মঞ্চে আসলে চলমান বক্তৃতা থামিয়ে দিয়ে তাদেরকে বক্তব্য দিতে সময় দিতে হয়। এতে আলোচকের আলোচনায় ছন্দপতন হয়। শ্রোতাদের মনোযোগ বিনষ্ট হয়। সময়ের অপচয় হয়। সর্বোপরি এটি দাওয়াতের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। তারপরও বাধ্য হয়েই কর্তৃপক্ষ এমন সুযোগ দিয়ে থাকেন। উল্লেখ্য, এই নেতারা যদি কিছু সময় বসে বক্তৃতা শ্রবণ করতেন, তাহ’লে কতই না সুন্দর হ’ত এবং তাদের উপকারে আসতো। কিন্তু আদৌ তারা বক্তৃতা শুনতে আসে না।

★হাদিয়া না বিনিময়?… ওয়াজ-মাহফিলে বক্তাদের হাদিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এ নিয়ে আজকাল অনেক বাতচিত হচ্ছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে যেন ইসলামিক আলোচকদের দরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কোন কোন বক্তার ডিমান্ড লাখ টাকাও ছাড়িয়েছে। দূর অতীতে দ্বীনের দাঈগণ পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় চড়ে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। নিকট অতীতেও রিক্সা, ভ্যান, মোটর সাইকেল, ঘোড়ার গাড়ী, মহিষের গাড়ী, নৌকা ইত্যাদিতে চড়ে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। অথচ আজকাল আমরা প্রাইভেটকার, মাইক্রো, বিমান এমনকি হেলিকপ্টারে চড়ে দাওয়াতী কাজ করছি। তারপরও তাদের সেই খুলূছিয়াত আমাদের মধ্যে নেই। তাদের সেই নিঃস্বার্থ দাওয়াত এখন শুধুই স্মৃতি। আমাদের সবকিছুর মধ্যে কেন যেন স্বার্থপরতা জড়িয়ে আছে। হয় তা আর্থিক বা মার্যাদাগত অথবা অন্য কোন বিষয়ে। অগ্রিম বায়না না হ’লে আমরা মাহফিলের তারিখ দেই না। কাঙ্ক্ষিত হাদিয়া পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে বলি ডেইট ফাঁকা নেই। আমাদের প্রাইভেট সেক্রেটারী প্রয়োজন হয়। নিজে না চাইতে পারলেও পিএস বা গাড়ীর ড্রাইভারের মাধ্যমে উদ্দেশ্য হাছিল করা হয়। আমরা এতটাই নিচে নেমেছি যে, বিকাশে হাদিয়া পাঠালে বিকাশ খরচটাও চাইতে আমাদের বাধে না। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া খুবই জরূরী। হাদিয়া অর্থ উপহার বা উপঢৌকন। হাদিয়া ইসলামে সিদ্ধ। রাসূল (সা:) হাদিয়া বিনিময়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন…
تَهَادُوا تَحَابُّوا
অনুবাদ:‘তোমরা পরস্পর হাদিয়া বিনিময় কর, তাহ’লে তোমাদের মধ্যে মুহাববত সৃষ্টি হবে’।
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন,

كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقْبَلُ الْهَدِيَّةَ وَيُثِيبُ عَلَيْهَا،

অনুবাদ:‘রাসূল (সা:) হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং তার প্রতিদানও দিতেন’।
হযরত আবূ সালামা বলেন,

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُ الْهَدِيَّةَ، وَلَا يَقْبَلُ الصَّدَقَةَ،

অনুবাদ:‘রাসূল (সা:) হাদিয়া খেতেন, কিন্তু ছাদাক্বা খেতেন না’।

সুতরাং এন্তেজামিয়া কমিটির পক্ষ থেকে বক্তাকে স্বেচ্ছায় প্রদত্ত হাদিয়া অথবা পাথেয় গ্রহণ করা জায়েয। তবে এটি যদি বক্তার ডিমান্ড বা চাওয়া হয় বা দরকষাকষি করে নির্ধারণ করা হয়, তবে তা আদৌ সিদ্ধ নয়। তখন এটি আর হাদিয়া থাকে না, বিনিময় হয়ে যায়। নবী-রাসূলগণ এমনকি সাহাবীগণের কেউ দ্বীনী দাওয়াতের বিনিময় গ্রহণ করতেন না। যেমন নূহ (আঃ) বলেছিলেন,

وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِيْنَ،

অনুবাদ:‘আমি তোমাদের নিকটে এজন্য (দ্বীন প্রচারের জন্য) কোন প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো কেবল বিশ্বপালকের নিকটেই রয়েছে’ (শু‘আরা ২৬/১০৯)।

হযরত হূদ (আঃ) স্বীয় কওমের লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন,

يَاقَوْمِ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى الَّذِي فَطَرَنِي أَفَلَا تَعْقِلُوْنَ، ‘হে

অনুবাদ:আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের কাছে এর কোন বিনিময় চাই না। এর বিনিময় তো কেবল তাঁর কাছেই রয়েছে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তবুও কি তোমরা বুঝ না?’ (হূদ ১১/৫১)।

রাসূল (সা:)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন,

قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ
অনুবাদ: ‘তুমি ওদের বলে দাও, আমি তোমাদের কাছে কোনরূপ বিনিময় চাই না এবং আমি এতে ভানকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই’ (সূরা:ছোয়াদ ৩৮/৮৬)।

অন্যত্র তিনি বলেন,

قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِلَّا مَنْ شَاءَ أَنْ يَتَّخِذَ إِلَى رَبِّهِ سَبِيلًا

অনুবাদ:‘তুমি বল, আমি তোমাদের নিকট এই দাওয়াতের বিনিময়ে কোন প্রতিদান চাই না। কিন্তু যে ব্যক্তি চায় আল্লাহর পথে ব্যয়ের মাধ্যমে তার প্রতিপালকের (সন্তুষ্টির) পথ অবলম্বন করতে পারে’ (সূরা:ফুরকান ২৫/৫৭)।

তিনি বলেন,

قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْعَالَمِينَ

অনুবাদ:‘বলে দাও যে, এর (অর্থাৎ কুরআন বা দ্বীন প্রচারের) বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। বস্ত্ততঃ এই কুরআন বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ মাত্র’ (আন‘আম ৬/৯০)।
আল্লাহ আরো বলেন,

اتَّبِعُوا مَنْ لَا يَسْأَلُكُمْ أَجْرًا وَهُمْ مُهْتَدُونَ

অনুবাদ: ‘তোমরা অনুসরণ কর তাদের, যারা তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চায় না এবং তারা সুপথ প্রাপ্ত’ (ইয়াসীন ৩৬/২১)।

উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে এ কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয় যে, দ্বীন প্রচারের কোন দুনিয়াবী পারিশ্রমিক বা বিনিময় হয় না। কেননা এর বিনিময় একমাত্র মহান আল্লাহই দিবেন।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আয়োজকদের গাফেলতীও ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। মাহফিল শেষ হওয়ার পর আয়োজকদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সঠিকভাবে পাথেয় দেওয়া হয় না। বক্তার অবস্থান, থাকা-খাওয়া অথবা ফিরে যাওয়া কোনটারই উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকে না। যতটা না মাহফিলের আগে বক্তার কদর থাকে মাহফিল শেষ হ’লে এর কানাকড়িও আর অবশিষ্ট থাকে না। এই আচরণ চরমভাবে নিন্দনীয়।

★পরিশেষে বলবো… একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও দ্বীনি সমাজ গড়ে তোলার জন্য দাওয়াতের কোন বিকল্প নেই। আর ওয়ায-মাহফিল দাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। উপমহাদেশে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই স্বচ্ছ মাধ্যমটি যেন কখনো অস্বচ্ছ না হয়, সুবিধাভোগী ও স্বার্থপর শ্রেণী কর্তৃক কালিমালিপ্ত না হয়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। আলেম ও বক্তাদেরকেও এ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কথা বলায় হ’তে হবে আরো শালীন। পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসের দলীলভিত্তিক বাণী নিঃস্বার্থভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য হ’তে হবে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তবেই নেমে আসবে এলাহী মদদ। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন-আমীন!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button