
জেলা প্রতিনিধি, রাজবাড়ীর: “আজকে বাস থেকে না নামলে নির্ঘাত মারা যেতাম। আমি সাঁতার পারি না। আজ অনেক বড় একটি বিপদ থেকে বাঁচলাম। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।”—কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন এসবি সুপার ডিলাক্সের যাত্রী মৌমিতা শেখ। তিনি কুষ্টিয়ার মজমপুর থেকে একাই বাসে উঠেছিলেন ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
শুক্রবার (৫ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে এসবি সুপার ডিলাক্স পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। তবে বাসে কোনো যাত্রী না থাকায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান সবাই।
দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মৌমিতা শেখ বলেন, “সকাল ৭টার দিকে কুষ্টিয়ার মজমপুর থেকে এসবি সুপার ডিলাক্সে উঠি। আমাদের বাসটি সাড়ে ৯টার একটু আগে দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ফেরিঘাটে আসে। ফেরিঘাটে প্রবেশের আগেই বাসের সুপারভাইজার সব যাত্রীদের নেমে যেতে বলেন। তখন আমিসহ অন্যান্য যাত্রীরা নেমে পড়ি। নেমে যখন সংযোগ সড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে আসছিলাম, ঠিক তখনই দেখি বাসটি ফুল স্পিডে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গেল। আমরা বাস থেকে সবাই আগে নেমে গিয়েছিলাম বলেই আজ বেঁচে আছি।”
ঘাট ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “ঘাট ব্যবস্থাপনায় সরকারের আরও পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সংযোগ সড়কটি অনেক খাড়া। এখানে দ্রুত সংস্কার কাজ করা উচিত, না হলে এরকম দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। দুর্ঘটনার আসল কারণগুলো সরকারের সঠিকভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।”
দুর্ঘটনার পর পরই উদ্ধার অভিযানে নামে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রায় আড়াই ঘণ্টার প্রচেষ্টায় উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ডুবে যাওয়া বাসটিকে নদী থেকে টেনে তুলতে সক্ষম হয়। এই ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, “বাসে কোনো যাত্রী ছিল না, তাই বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে যাত্রীদের মালামালগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা এখন যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত মালিকদের মালামাল বুঝিয়ে দেব।”
তিনি আরও যোগ করেন, “সবার প্রতি অনুরোধ, আপনারা সচেতন থাকবেন। ফেরিতে ওঠার সময় অবশ্যই বাস থেকে নেমে যাবেন এবং লঞ্চে যেন অতিরিক্ত যাত্রী না ওঠে সেদিকে খেয়াল রাখবেন। এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।”
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৫ মার্চ কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ‘সোহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি বাস দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে উঠতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বাসের ২৬ জন যাত্রী প্রাণ হারিয়েছিলেন। আজকের ঘটনাটি যেন সেই স্মৃতিকেই আবারও মনে করিয়ে দিল, তবে নৌ পুলিশের তৎপরতা ও চালকের সহকারীদের সতর্কতায় এবার রক্ষা পেয়েছে ৪০টি প্রাণ।




