পিরোজপুরে ১০৮ চুলায় চিতই পিঠার মহোৎসব: ৯২ বছরের ঐতিহ্যে জনসমুদ্র

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিরোজপুর | ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬

তীব্র শীত আর কুয়াশা উপেক্ষা করে পিরোজপুরের নাজিরপুরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী চিতই পিঠা উৎসব। উপজেলার কুমারখালী বাজার সংলগ্ন দেবলাল চক্রবর্তীর বাড়ির কালীমন্দির প্রাঙ্গণে ১০৮টি মাটির চুলায় সারি সারি পিঠা তৈরির এই আয়োজন এখন কেবল ধর্মীয় আচার নয়, পরিণত হয়েছে এক সর্বজনীন উৎসবে।

রবিবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় শুরু হওয়া এই উৎসব চলে সোমবার সকাল পর্যন্ত। সরেজমিনে দেখা যায়, সারিবদ্ধ ১০৮টি মাটির চুলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নারীরা ব্যস্ত হাতে চালের গুঁড়া দিয়ে চিতই পিঠা তৈরি করছেন। উৎসবের সূচনা করেন পুরোহিত দেবলাল চক্রবর্তী। মন্ত্রপাটের মাধ্যমে তিনি প্রতিটি চুলায় আগুন জ্বালিয়ে দিলে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। এই পিঠা প্রথমে প্রতিমার ভোগে অর্পণ করা হয় এবং পরে উপস্থিত হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মাঝে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়।

দীর্ঘ ৯২ বছরের এই উৎসবকে ঘিরে রয়েছে গভীর লোকবিশ্বাস। গত বছর মানত করে সন্তান লাভ করা শ্যামা পাল বলেন, “দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ায় গত বছর এখানে এসে মানত করেছিলাম। এক মাসের মধ্যেই সুখবর পাই। এবার সন্তান কোলে নিয়ে পিঠা বানাতে এসেছি।”

উৎসবটি এখন ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সন্তান লাভের আশায় এখানে আসা এক মুসলিম গৃহবধূ বলেন, “মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসার জায়গা তো সবার জন্য, তাই আমিও এসেছি।”

১৯৮৬ সাল থেকে বংশপরম্পরায় এই মন্দিরের পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করছেন দেবলাল চক্রবর্তী। তিনি জানান, ১৯৩৪ সালে (৯২ বছর আগে) তার পূর্বপুরুষ হরষিত আনন্দ চক্রবর্তী মাঘের অমাবস্যা তিথিতে এই কালীমন্দিরে মেলার আয়োজন শুরু করেন। অমাবস্যায় শুকনা খাবার খাওয়ার রীতি থেকে চিতই পিঠা তৈরির নিয়মটি চালু হয়। সময়ের পরিক্রমায় পুণ্যার্থীর সংখ্যা বাড়ায় এখন তা বিশাল উৎসবে রূপ নিয়েছে।

নাজিরপুরের এই অনন্য আয়োজনটি এখন পিরোজপুর জেলার লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button