প্রাথমিক স্কুলে আসছে শিশুতোষ আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, বদলাবে শেখার পরিবেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: পিঠে ভারী স্কুলব্যাগ আর চার দেয়ালের গুমোট পরিবেশের প্রথাগত ধারণা বদলে দেওয়ার বড় পরিকল্পনা করছে সরকার। শিশুদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষগুলো একেকটি ‘রূপকথার জগতে’ রূপান্তরের একটি বড় প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। 

শৈশবের শুরুতেই কোমলমতি শিশুদের স্কুলভীতি দূর করতে এবং খেলার ছলে শিক্ষার ভিত মজবুত করতে ৩৪২ কোটি টাকার এক বিশাল মেগা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে।

এই সমীক্ষা পরিকল্পনা অনুযায়ী চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে দেশের ৫১২টি উপজেলার ৮ হাজার ২১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৈরি হতে পারে আধুনিক ও শিশুতোষ স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ। যেখানে চক-ডাস্টারের বদলে ঠাঁই পাওয়ার কথা রয়েছে স্মার্ট টিভি আর ই-লার্নিং সরঞ্জামের।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈপ্লবিক ও স্মার্ট রূপে রূপান্তর করতে মন্ত্রণালয় মোট ১৩টি বড় উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অননুমোদিত এই নতুন প্রকল্পগুলো এরইমধ্যে সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির ‘সবুজ পাতায়’ (গ্রিন পেজ) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আর এই ১৩টি মেগা প্রকল্পের মধ্যেই অন্যতম প্রধান এবং আকর্ষণীয় একটি প্রকল্প হলো ‘নির্বাচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষ আকর্ষণীয়ভাবে সজ্জিতকরণ প্রকল্প’।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) জন্য প্রস্তুত করা এক সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে এই প্রাক-প্রাথমিক সজ্জা প্রকল্পের বিস্তারিত রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এএসডি কনসালটেন্সি সার্ভিস’ এই সমীক্ষা প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ৪ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিদ্যালয়কে আকর্ষণীয় করে তোলাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে অনেক শিশু যে স্কুলভীতিতে ভোগে, তা দূর করতেই এই সজ্জার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়ে বাস্তবায়িত হলে শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি, ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে সমীক্ষায় আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদিত ফরম্যাট অনুযায়ী তৈরি এই প্রতিবেদনে শ্রেণিকক্ষগুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশেষ চারটি ‘লার্নিং কর্নারে’ ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

 এগুলো হলো কল্পনা কোণ, এখানে শিশুরা সৃজনশীল চিন্তা ও অভিনয়ের সুযোগ পাবে। ব্লক ও নাড়াচাড়া কোণ, এই কোণটি হবে বিভিন্ন গঠনমূলক খেলার সরঞ্জাম সমৃদ্ধ। বালি ও পানি কোণ, প্রকৃতির উপকরণের মাধ্যমে এখানে থাকবে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ। বই ও অঙ্কন কোণ, এটি শিশুদের ছবি দেখা ও আঁকার জন্য নির্ধারিত থাকবে।

এছাড়া আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষে একটি করে স্মার্ট টিভি স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এই টিভির মাধ্যমে শিক্ষামূলক কার্টুন, অ্যানিমেশন এবং জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রদর্শনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে করে জটিল সব বিষয় শিশুদের কাছে সহজবোধ্য হবে এবং ডিজিটাল কন্টেন্টের মাধ্যমে তারা দ্রুত শিখতে পারবে। সেই সঙ্গে লার্নিং কর্নার ও প্রযুক্তির এই মিশেলে শ্রেণিকক্ষগুলো একেকটি আধুনিক ই-লার্নিং সেন্টারে পরিণত হতে পারে।

নতুন পরিকল্পনায় দীর্ঘক্ষণ ক্লাসে থাকার ক্লান্তি দূর করতে শিশুদের জন্য শ্রেণিকক্ষেই আরামদায়ক বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ রয়েছে প্রতিবেদনে। এছাড়া পরিবেশের ওপর এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না এবং কোনো নতুন ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না বলেও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে।

সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রকল্পের সম্ভাব্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪২ কোটি ৬১ লাখ ৬১ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ দশমিক ২৪ শতাংশ অর্থই ব্যয় করার প্রস্তাব করা হয়েছে শ্রেণিকক্ষ সজ্জার মূলধন কাজে। ২০২৫ সালের বাজারদর অনুযায়ী এই সম্ভাব্য বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

সারাদেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলাতেই এই প্রকল্পের মডেল বিস্তৃতির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫০৫টি সরকারি মডেল স্কুল, পিপিটিআই সংলগ্ন ৬৫টি পরীক্ষামূলক স্কুল এবং দেশের সেরা নির্বাচিত কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করার প্রাথমিক তালিকা করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে প্রাক-প্রাথমিক সজ্জা ছাড়াও আরও ১২টি উন্নয়ন প্রকল্পের কথা জানিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেগুলো হলো— ১. সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্প।

২. বিদ্যমান মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১১টি সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প।

৩. জরাজীর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প।

৪. বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ উন্নয়ন প্রকল্প।

৫. বহুল প্রতীক্ষিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড ডে মিল প্রকল্প (২য় পর্যায়)।

৬. নেক্সটজেন প্রাইমারি এডুকেশন প্রোগ্রাম।

৭. পার্বত্য জেলাগুলোর বিদ্যুৎবিহীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুতায়ন প্রকল্প।

৮. ঢাকা মহানগরীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প।

৯. সারাদেশের সব পিটিআইয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প।

১০. ইউনিয়ন মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্প।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এবং সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এখন একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করা হবে। পরে তা পরিকল্পনা কমিশন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের পর সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দ মিললেই কেবল মাঠপর্যায়ে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারবে। অনুমোদন পেলে আগামী ৩৬ মাসের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) এটি বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে প্রতিবেদনে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

“প্রাথমিক শিক্ষাকে আনন্দময় ও শিশুবান্ধব করে তুলতে চেষ্টা করা হচ্ছে”

দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ভয়মুক্ত, আনন্দময় ও শিশুবান্ধব করে তোলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বহুমুখী ও দূরদর্শী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।

নজরবিডিকে তিনি বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষাকে আনন্দময় ও শিশুবান্ধব করে তুলতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। আমাদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের জন্য বিদ্যালয়কে একটি আকর্ষণীয় ও ভালোবাসার জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা। আমাদের দেশের শিশুদের প্রথাগত শিক্ষার যে একঘেয়েমি ও ভীতি রয়েছে, তা দূর করতে শ্রেণিকক্ষে একটি আধুনিক, চাক্ষুষ ও বিজ্ঞানসম্মত পরিবেশ গড়ে তোলা এই মুহূর্তে সময়ের দাবি ছিল। প্রাক-প্রাথমিক স্তরেই যদি আমরা আমাদের শিশুদের শিক্ষার বুনিয়াদকে প্রযুক্তিভিত্তিক, রঙিন ও আকর্ষণীয় করতে পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনেক বেশি দক্ষ, চিন্তাশীল ও সৃজনশীল হয়ে উঠবে।”

বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়ে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার যে মহাপরিকল্পনাগুলো হাতে নিচ্ছে, তার মূল সুফল যেন দেশের প্রতিটি প্রান্তিক অঞ্চলের শিশু পায়, তা নিশ্চিত করা হবে। এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন যেন শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে এবং কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়া একদম তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায়, সরকার তা কঠোরভাবে মনিটরিং করবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button