ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের দীর্ঘায়িত আন্দোলন দেশে তৈরি পোশাক খাতে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই অস্থিরতার ফলে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও তাৎক্ষণিক রপ্তানি আয় কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, সংকট দ্রুত সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রয়াদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও পোশাক খাতের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানকে ঝুঁকিতে ফেলবে।

গত ২৯ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের পর গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও অসন্তোষ কমেনি। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্যানুসারে, গত সোমবার অন্তত ৬৭৯ থেকে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল, যেখানে প্রায় ১৭ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। রবি ও সোমবার—মাত্র দুই দিনেই প্রায় ৭ কোটি ডলারের (প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা) রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কারখানা বন্ধ থাকলেও অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কর্মীদের বেতনসহ সব ধরনের পরিচালন ব্যয় চালু থাকে। ফলে উদ্যোক্তারা চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছেন। পরবর্তীতে উৎপাদন ঘাটতি মেটাতে অতিরিক্ত ওভারটাইম করাতে হবে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট করতে না পারলে ব্যয়বহুল আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হবে অথবা ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে হবে, যা মুনাফা কমিয়ে ব্যবসায় ধস নামাতে পারে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্য সরবরাহের সময়সীমা ও স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। সুইডেনভিত্তিক একটি বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই আগামী দুই মাসের অর্ডার কমানোর চিন্তা করছে। অনেক ক্ষেত্রে অর্ডার ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, স্বল্পমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির চেয়ে ভবিষ্যতে অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়া বেশি উদ্বেগের। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও উল্লেখ করেছেন যে, উৎপাদন বন্ধ থাকায় ক্রেতারা সময়মতো পণ্য পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিজিএমইএর পরিচালক মো. হাসিব উদ্দিনের মতে, বছরে এক দিনের পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন বন্ধ থাকার সার্বিক আর্থিক ও পরিচালন ক্ষতির ধাক্কা প্রায় ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, একবার ক্রেতারা বিকল্প বাজার বেছে নিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও সেই অর্ডার ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সুতা, কাপড়, অ্যাকসেসরিজ, প্যাকেজিং ও পরিবহনের মতো সহযোগী শিল্পেও। কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমলে শেষ পর্যন্ত শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে শ্রমিকদের কাজ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে তার দায়িত্ব পালন করেছে। বর্তমান অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে ভারতসহ অন্যান্য দেশ সুবিধা পাবে, যা চূড়ান্ত বিচারে শ্রমিকদের জন্যই মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে।