হেঁটে এসে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি, পড়ে গেলে এলোপাতাড়ি কোপ

জেলা প্রতিনিধি, খুলনা: সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস হওয়ায় আজ রোববার সকালে খুলনার আদালতপাড়া ছিল মানুষে ঠাসা। মহানগর দায়রা জজ আদালতের বাইরে সড়কেও ছিল মানুষের ভিড়। ভর দুপুরে এমন মানুষের সামনে হেঁটে এসে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা হয় দুই যুবককে। গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আবার ওই সড়ক দিয়েই পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা ।

দুপুর সোয়া ১২টার দিকে খুলনা মহানগর দায়রা আদালতের সামনে ঘটে এই ঘটনা। ঘটনাস্থল থেকে ধারালো অস্ত্র ও গুলির খোসা উদ্ধার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

নিহতরা হলেন, ফজলে রাব্বি রাজন ও হাসিব হাওলাদার। এর মধ্যে রাজন রুপসার বাগমারার দক্ষিণ ডাঙ্গা এলাকার ইজাজ শেখের ছেলে। হাসিব নগরীর নতুন বাজার এলাকার মান্নান হাওলাদারের ছেলে। তারা খুলনার আলোচিত সন্ত্রাসী শেখ পলাশের অনুসারী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অস্ত্র মামলায় হাজিরা দিতে মহানগর দায়রা জজ আদালতে এসেছিলেন রাজন ও হাসিব। হাজিরা দিয়ে প্রধান ফটক থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ৬ থেকে ৭ জনের একটি দল রাজনের ঘাড়ে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়। অপর একজন এসে তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে। একই সময় হাসিবকে গুলি করে। তারা মাটিতে পড়ে গেলে কয়েকজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এ সময় আশপাশের মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যান। কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছুড়ে দুর্বৃত্তরা। এরপর তারা পূর্বপাশের সড়ক দিয়ে চলে যায়।

হত্যাকাণ্ডের সময় আদালত ভবনের বারান্দায় শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদেরই একজন মোবাইলে হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করেন। আদালত চত্বরের সীমানা প্রাচীরের গা ঘেঁষে এক যুবক পড়ে আছে। আরেক যুবক রাম দা দিয়ে তাকে কুপিয়ে যাচ্ছে। এ সময় পিস্তল হাতে আরও কয়েকজন যুবক আশপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিছুসময় পর পূর্বপাশের সড়ক দিয়ে দলবেঁধে চলে যাচ্ছেন তারা।

আইনজীবী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর সোনাডাঙ্গা থানায় দায়ের হওয়া একটি অস্ত্র মামলায় হাজিরা দিতে আজ সকালে আদালতে যান রাজন ও হাসিব। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে আগে থেকেই ৬ থেকে ৭ জন দুর্বৃত্ত সার্কিট হাউজ ও আশপাশের সড়কে অপেক্ষায় ছিল। হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

খুলনা সদর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম জানান, রাজন শীর্ষ দুর্বৃত্ত পলাশের সহযোগী। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ ছয়টি মামলা রয়েছে। গত মার্চ মাসে সোনাডাঙ্গা থানায় দায়ের করা অস্ত্র মামলার ৬ জন এজাহারভুক্ত আসামিদের একজন ছিলেন রাজন। ওই মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে হাসিব হাওলাদারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মামলার চার্জশিটে দু’জনেরই নাম রয়েছে। এজন্য দু’জন একসঙ্গে আদালতে যান।

পুলিশের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, খুলনার আরেক শীর্ষ দুর্বৃত্ত রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’ গ্রুপের সঙ্গে পলাশ গ্রুপের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরে এর আগেও একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিছুদিন আগে কারাগারের ভেতরেও দুই গ্রুপের হাতাহাতি হয়। এর প্রেক্ষিতে কারাগারে থাকা সন্ত্রাসীদের দেশের বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। পুরানো দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কিনা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, বিচারকদের পরামর্শ অনুযায়ী আদালতের চত্বরে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। ঘটনাটি আদালত চত্বরের বাইরে হয়েছে। আমরা বিভিন্ন সোর্স কাজে লাগিয়ে হত্যার কারণ ও জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।

প্রসঙ্গত, অভ্যুত্থানের পর গত ১৬ মাসে খুলনায় ৪৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সন্ত্রাসীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে হত্যাকাণ্ড হয়েছে ২০টি। এর প্রতিটিতেই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button