কোরআন ও হাদিসের আলোকে হজ্জের ইতিহাস,শিক্ষা,গুরুত্ব ও তাৎপর্য…

অ্যাক্টিভিষ্ট| লেখক| গবেষক|
✍️মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকী।

★ভূমিকা: ইসলামের মূল স্তম্ভসমূহের পঞ্চমটি হল হজ্বে বায়তুল্লাহ।ঈমান, নামায,যাকাত ও রোযার পরই হজ্বের অবস্থান। হজ্ব মূলত কায়িক ও আর্থিক উভয়ের সমন্বিত একটি ইবাদত।তাই উভয় দিক থেকে সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর হজ্ব পালন করা ফরয।অর্থাৎ হজ্ব আদায়ে সক্ষম এমন শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচাপাতি ও আসবাবপত্রের অতিরিক্ত হজ্বে যাওয়া-আসার ব্যয় এবং হজ্ব আদায়কালীন সাংসারিক ব্যয় নির্বাহে সক্ষম এমন সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর হজ্ব আদায় করা ফরয। হজ্ব প্রত্যেক মুসলমানের উপর সারা জীবনে একবারই ফরয হয়। একবার ফরয হজ্ব আদায়ের পর পরবর্তী হজ্বগুলো নফল হিসেবে গণ্য হবে।
হজ্জ আমাদের শিক্ষা দেয় বিনয়, আত্মত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের। এই ইবাদতের মাধ্যমে একজন মুসলমান শুধুই নিজেকে পরিশুদ্ধ করেন না,বরং মানবতার,সাম্যের এবং তাওহিদের বাস্তব রূপ উপলব্ধি করেন।আরাফাতের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে লাখো কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—”লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক”,যার প্রতিধ্বনি আকাশ-বাতাসে প্রতিফলিত হয়ে অন্তরে আলো জ্বেলে দেয়। সেই আলো আত্মাকে আল্লাহমুখী করে তোলে, গুনাহর বোঝা লাঘব করে এবং জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার প্রেরণা জোগায়।
এই ব্লগে আমরা হজ্জের ইতিহাস,শিক্ষা,গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব,যা একজন মুসলমানের জীবনে এক নতুন আলোর দিশা দেখায়।

★হজ্জের আদি ইতিহাস…
হজ্জের সূচনা মানব জাতির পিতা হযরত আদম (আ.) এর সময় থেকেই। হাদীস ও বিভিন্ন ইসলামী ঐতিহাসিক গ্রন্থে বর্ণিত আছে, হযরত আদম (আ.)-কে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে প্রেরণের পর তিনি আল্লাহর নির্দেশে কাবা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেন। কাবা ছিল তাওহিদের প্রতীক—আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসীদের ইবাদতের কেন্দ্রবিন্দু। পরে কালপরিক্রমায় এই ঘর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং পুনরায় নবী ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.) আল্লাহর হুকুমে তা নতুনভাবে নির্মাণ করেন। তাঁরা নির্মাণ কাজের সময় বারবার দোয়া করছিলেন…

وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ ۖ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

অনুবাদ:”আর যখন ইব্রাহিম ও ইসমাঈল কাবার ভিত্তি স্থাপন করছিলেন,তখন বলেছিলেন: হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি আমাদের পক্ষ থেকে এ (কাজ) কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা,সর্বজ্ঞ।”
(সূরা আল-বাকারা: ১২৭)

এই মহান কাজের মধ্য দিয়ে শুধু একটি ঘরই নির্মিত হয়নি,বরং একটি অনন্য আধ্যাত্মিক যাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর এই আত্মত্যাগ,আনুগত্য এবং তাওহিদের উপর অবিচলতা পরবর্তীকালে হজ্জের প্রতিটি রীতির অন্তরস্থ মর্ম হয়ে দাঁড়ায়।

কালক্রমে হজ্জ একটি নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করে এবং মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে এই ইবাদত তার পরিপূর্ণতা লাভ করে। তিনি বিদায় হজ্জে তা বাস্তবে রূপ দিয়ে সকল মুশরিক রীতি ও বিদআত পরিহার করে হজ্জকে বিশুদ্ধ তাওহিদের প্রতীক বানান।

★ইসলামপূর্ব আরব হজ্জ…
ইসলামপূর্ব আরব সমাজে কাবা ঘরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও,হজ্জের প্রকৃত আত্মিক ও তাওহিদভিত্তিক উদ্দেশ্য বিকৃত হয়ে পড়েছিল। কাবা তখন ছিল বহু মূর্তির আবাসস্থল—তাদের বিশ্বাস ছিল, এসব মূর্তি নাকি আল্লাহর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করবে। পাথরের তৈরি নির্জীব প্রতিমাগুলোর সামনে তারা সিজদাহ করত, মানত করত এবং কুরবানি দিত। হজ্জের পবিত্রতা তখন হারিয়ে গিয়েছিল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা ও ধর্মীয় বিকৃতির ভিড়ে। তাদের মধ্যে এমন কুসংস্কার প্রচলিত ছিল যে,নিজের বানানো পাপ মোচনের জন্য তারা নগ্ন হয়ে কাবা প্রদক্ষিণ করত। তারা মনে করত, দুনিয়ার কাপড় পরে তাওয়াফ করলে গুনাহ মোচন হবে না। এমনকি তাওয়াফে তারা নিজেদের জাতিগত অহংকার ও বংশগত গর্ব প্রকাশ করত, যা হজ্জের বিনয় ও আত্মসমর্পণের মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
এই ভ্রান্ত ধর্মীয় চর্চার অবসান ঘটান মানবতার মুক্তির দূত,হযরত মুহাম্মদ সা.। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি গ্রহণ করে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন—তাওহিদই হজ্জের মূল ভিত্তি। তিনি হজ্জের প্রতিটি রীতি থেকে
মূর্তিপূজা,অশ্লীলতা ও কুসংস্কার নির্মূল করেন এবং হজ্জকে এমন এক বিশুদ্ধ ইবাদতের রূপ দেন,যা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়।

এই ভ্রান্ত ধর্মীয় চর্চার অবসান ঘটান মানবতার মুক্তির দূত, হযরত মুহাম্মদ সা.। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি গ্রহণ করে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন—তাওহিদই হজ্জের মূল ভিত্তি। তিনি হজ্জের প্রতিটি রীতি থেকে মূর্তিপূজা, অশ্লীলতা ও কুসংস্কার নির্মূল করেন এবং হজ্জকে এমন এক বিশুদ্ধ ইবাদতের রূপ দেন,যা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়।

★বিদায় হজ্জের খুতবার গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা…
১-সকল মুসলমান সমান।
২-নারীদের অধিকার সংরক্ষণ।
৩-সুদ ও রক্তের প্রতিশোধ নিষিদ্ধ।
৪-আমানতের গুরুত্ব।
৫-কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা।

★ হজ্জ পালনের নিয়ম-কানুন…
১-ইহরাম গ্রহণ: নিজেকে দুনিয়াবি পার্থক্য থেকে আলাদা করা।
২-তাওয়াফ: আল্লাহর ঘরের চারপাশে প্রদক্ষিণ – ইবাদতে কেন্দ্রীভূত হওয়া।
৩-সাঈ (সাফা-মারওয়া): হাজেরা আ.-এর ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের স্মৃতি।
৪-আরাফাতের ময়দান: হজ্জের মূল রোকন – মানবতার একত্রিত হওয়ার প্রতীক।
৫-মিনার রাতযাপন: আত্মত্যাগ, ধৈর্য ও অনুশীলনের অনুশাসন।
৬-রামি (শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ): খারাপ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
৭-কুরবানি: হযরত ইব্রাহিম আ.-এর আত্মত্যাগের স্মরণ।
৮-মাথা মুণ্ডানো (হালক) বা চুল ছাঁটা (কসর): শরীরিক পরিচ্ছন্নতার প্রতীক। পুরুষরা মাথা মুণ্ডান করেন বা চুল ছোট করেন; নারীরা চুলের সামান্য অংশ কাটেন।
৯-তাওয়াফে ইফাযা ও বিদায়ী তাওয়াফ: ইবাদতের পরিপূর্ণতা।

★হজ্জের গুরুত্ব ও তাৎপর্য…
সালাত, সিয়াম ও যাকাতের মত হজ্জ পালন করা সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের উপর ফরয।আল্লাহ তা‘আলা বলেন…

وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ

অনুবাদ:‘আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ্জ করা ঐ ব্যক্তির উপর ফরয করা হ’ল,যার এখানে আসার সামর্থ্য রয়েছে। আর যে ব্যক্তি তা অস্বীকার করে (সে জেনে রাখুক যে,) আল্লাহ জগদ্বাসী থেকে মুখাপেক্ষীহীন’
(আলে ইমরান ৩/৯৭)
এটিই হজ্জ ফরয হওয়ার মূল দলীল।
২য় দলিল…
وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ فَإِنْ أُحْصِرْتُم فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ

অনুবাদ:‘আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ ও ওমরাহ পূর্ণ কর। কিন্তু যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও,তাহ’লে যা সহজলভ্য হয়,তাই কুরবানী কর’ (বাক্বারাহ ২/১৯৬)।

এ আয়াতটি হজ্জ ফরয হওয়ার পাশাপাশি ওমরাহ ফরয হওয়ারও দাবী রাখে,যে ব্যাপারে অধিকাংশ সাহাবী ও উলামায়ে কেরাম অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

★হাদিসের আলোকে হজ্জের গুরুত্ব ও তাৎপর্য…

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم بُنِىَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ. متفق عليه-

অনুবাদ:ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপরে প্রতিষ্ঠিত (১) তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করা এ মর্মে যে,আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল (২) ছালাত কায়েম করা (৩) যাকাত প্রদান করা (৪) হজ্জ সম্পাদন করা ও (৫) রামাযানের ছিয়াম পালন করা’।
(বুখারী হা/৮; মুসলিম হা/১৬;)

হাদিসে প্রিয়নবী ইরশাদ করেন…
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ الأَقْرَعَ بْنَ حَابِسٍ سَأَلَ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ! الْحَجُّ فِىْ كُلِّ سَنَةٍ أَوْ مَرَّةً وَاحِدَةً قَالَ : بَلْ مَرَّةً وَاحِدَةً فَمَنْ زَادَ فَهُوَ تَطَوُّعٌ-

অনুবাদ:ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা আকরা‘ বিন হাবেস নবী করীম (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! হজ্জ কি প্রতি বছর ফরয না জীবনে একবারই ফরয? তিনি বললেন, না বরং হজ্জ জীবনে একবার ফরয। যে অধিক করবে তা তার জন্য নফল হবে’।
(আবুদাউদ হা/১৭২১; ইবনু মাজাহ হা/২৮৮৬;)

★পরিশেষে বলতে চাই…সুতরাং আমাদের উচিত হজ্জ সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি সম্পন্ন করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে এর গুরুত্ব ও ফযীলত বুঝে তদানুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন- আমীন!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button