

৯ জানুয়ারি ২০২৬
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রস্তুতি নিচ্ছে গোটা দেশ। এবারের নির্বাচন যেন অবাধ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর হয়— সেই লক্ষ্যেই সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে, নির্বাচনের আগে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের শীর্ষ দুই সংবাদপত্রের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ঘিরে সরকারের প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের রায়, মব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, জেলা প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, রোহিঙ্গা সংকট এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের সীমাবদ্ধতাসহ নানা বিষয়ে ঢাকা পোস্টের মুখোমুখি হয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মুছা মল্লিক।
শফিকুল আলম : নিজেকে মূল্যায়ন করার কিছু নেই। প্রশ্ন হলো আমি আমার কাজটা কতটা সফলভাবে করতে পেরেছি। আমার কাজ হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সিদ্ধান্ত ও বড় বড় সংস্কারগুলো মানুষকে জানানো। অনেক সময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জানাতে হয়, আবার কিছু সময় নির্বাহী সিদ্ধান্তও জানাতে হয়। আগে প্রেস সচিবরা এভাবে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করতেন না। আমরা কাজটা রিলিজিয়াসলি (নিষ্ঠার সঙ্গে) করছি।
আমরা সপ্তাহে দুই থেকে পাঁচটি পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলন করছি। আমরা মনে করি, এটি জনগণের ও বিপ্লবের সরকার, তাই সব তথ্য জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
যেহেতু এটি রাজনৈতিক সরকার নয়, তাই এখানে শিক্ষাবিদ, আমলা ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাদের অনেকের মধ্যেই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতে কিছুটা দ্বিধা কাজ করে। সেই ঘাটতি পূরণে আমরা নিয়মিত কাজ করছি। আমাদের প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজ এখন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস। আমরা মানুষের কাছে স্বচ্ছ থাকতে চেয়েছি। আমাদের সাফল্য-ব্যর্থতা দুই-ই আপনারা জানবেন; সমালোচনা করলেও আমরা বাধা দিই না।
শফিকুল আলম : যারা জুলাই আন্দোলন করেছে, তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল না? তাদের তো আরও বেশি নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল। শহীদ আনাস মাকে চিঠি লিখে আন্দোলনে গিয়েছিলেন। তিনি তো জানতেন, তার নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে। আমি তো ৫৬ বছর বেঁচে আছি। তার তো বয়স ১৪ থেকে ১৫ বা ১৬–১৭ হবে। তারা যদি ঝুঁকিকে ইগনোর (উপেক্ষা) করতে পারে, তাহলে তো তাদের চেয়ে আমার আরও কম ঝুঁকি, ঝুঁকি নেই বললেই চলে।
তারা যেভাবে শহীদ হয়েছে— নাফিসের কথা চিন্তা করেন, ফাইয়াজের কথা চিন্তা করেন। তারা তো কেউ পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্ট (রাজনৈতিক কর্মী) ছিল না। তারা জাতির প্রয়োজনে, জাতির ডাকে সাড়া দিয়ে জুলাই আন্দোলনে নেমেছিল। তারা ভালোভাবেই জানত, হাসিনার পুলিশ, হাসিনার সিকিউরিটি ফোর্স (নিরাপত্তা বাহিনী) এবং পার্টির অ্যাক্টিভিস্টরা যেভাবে মানুষকে খুন করছে, তারাও শহীদ হতে পারত। তারা কি পিছু হটেছে? ঠিকই তাদের কাজটা করেছে। দেশকে এক ধরনের নতুন স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। নতুন বাংলাদেশ দিয়ে গেছে।
আমার কাজটা আর কী? তারা আত্মত্যাগ ও শহীদ হওয়ার মাধ্যমে যে কাজটা করেছে, আমরা সেই কাজটার এক্সটেনশন (ধারাবাহিকতা) করছি। এর বাইরে কিছু না। এতে কিছু ঝুঁকি আছে। সো হোয়াট (তাতে কী), মেরে ফেলবে? ৮৩৬ জন তো আমাদের লিস্টেই আছে, আরও বাড়ছে। ইউএন (জাতিসংঘ)-এর হিসাবে তো আরও আছে। কত লোক গুম হয়েছে, কত মানুষ এই ১৫ বছরে শহীদ হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তো একটি বিশাল রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ‘নি ক্যাপিং’। হাসিনার আমলে একটা প্রথা ছিল, মানুষকে ধরে ধরে হাঁটুতে গুলি করার। কত লোককে তারা পঙ্গু করে ফেলেছে। সেই তুলনায় আমাদের ঝুঁকি কিছুই না। দেশ হিসেবে আমাদের ঝুঁকি আছে, কিন্তু আমাদের সত্য বলতে হবে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং দেশকে একটি গণতান্ত্রিক ট্রানজিশনে (রূপান্তর প্রক্রিয়ায়) নিয়ে যেতে হবে, যাতে ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুন্দর নির্বাচন হয় এবং সুন্দরভাবে ক্ষমতার পালাবদল হয়।
শফিকুল আলম : আমাদের সাংবাদিকরা মনে করেন, সরকার যেভাবে কাজ করে, সেটার অনেক কিছুই তারা জানেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সরকার কীভাবে কাজ করে, এ বিষয়ে তাদের জানার ঘাটতি রয়ে গেছে। তারা মনে করেন, সরকার অনেক কিছুই পারে। কিন্তু সরকার চাইলেই সবকিছু পারে না। অনেক ক্ষেত্রে তার হাত-পা বাঁধা থাকে। আমাদের সাংবাদিকরা খুব ভালো সাংবাদিকতাই করেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতায় চেক অ্যান্ড ব্যালান্স (ভারসাম্য রক্ষা)-এ কিছুটা সমস্যা হয়। আমি একজনের নামে নিরবচ্ছিন্নভাবে মিথ্যা কথা লিখে ফেলছি, কিন্তু স্বীকারও করছি না যে মিথ্যা কথা বলছি, এমনকি সরিও বলছি না। এটা কিন্তু বিদেশে পাবেন না।
পশ্চিমা দেশগুলোতে সাংবাদিকরা ফ্রিডম উপভোগ করেন, আবার তারা এটাও জানেন যে ভুল রিপোর্ট করলে তার সংবাদপত্র এবং তাকে ফাইন (জরিমানা) দিতে হবে। অনেক ধরনের ঝামেলা তিনি ফেস করতে পারেন। আমাদের এখানে সেই চর্চা নেই। আমাদের অনেক ক্ষেত্রে মালিকরা খুব প্রেশারে পড়লে সেই ছেলের চাকরি চলে যায়। তবে, কারও চাকরি যাওয়া উচিত নয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটা একটি সিস্টেমের মধ্যে আসা উচিত। কারও বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ছড়ানো, আমাদের সংখ্যালঘু ভাই-বোনদের নামে ঘৃণা ছড়ানো, কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করার জন্য ভায়োলেন্স ইনস্টিগেট (সহিংসতা উসকে দেওয়া) করলে অবশ্যই আপনাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। এই জায়গাগুলো নিয়ে আমাদের ডিবেট (আলোচনা) করা প্রয়োজন বলে মনে করি।
শফিকুল আলম : যেমন- ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’। আপনি ভাবছেন, সরকার এই কাজটা করে না কেন? এটা করলে তো লাভ হতো। কিন্তু সরকার যখন এই বিষয়টা চিন্তা করে, তখন এর সঙ্গে সম্পর্কিত— কারা কারা প্রভাবিত হবেন, এমন ৩০টা গ্রুপের কথা চিন্তা করতে হয়। যেমন- অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে সিগারেট বন্ধ করে দেওয়া হয় না কেন? এটা তো মারাত্মক স্বাস্থ্যহানি করে। প্রতি বছর এক লাখ ৩০ হাজার মানুষ সিগারেটের কারণে মারা যায়। ক্যানসার হয়, আলসার হয়। কিন্তু সরকার এটা এককভাবে বন্ধ করতে পারে না কেন? কারণ, এখানে অনেক ফ্রিডম-এর ইস্যু আছে। এখানে ট্যাক্স-এর ইস্যু আছে। এখান থেকে সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকা ট্যাক্স পায়, সেটা দিয়ে আবার অন্য জায়গায় বেতন দিতে হয়। সুতরাং আপনি ভাবছেন, সরকার এটা করে না কেন, কিন্তু সরকার তো অনেক কিছুই চিন্তা করে।
শফিকুল আলম : কিছু কিছু মব ভায়োলেন্স (গণপিটুনি/দলবদ্ধ সহিংসতা) হয়েছে, আমরা সেটা অস্বীকার করছি না। আপনাদের বুঝতে হবে, একটি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবং জুলাই-পরবর্তী বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে অনেক ধরনের অবস্থা তৈরি হয়েছে। এটাকে পুরো সমাজের একসঙ্গে মোকাবিলা করা উচিত ছিল। কিন্তু অনেকেই সেই রেসপন্স করেনি। ফলে, পুরো দায়িত্বটা সরকারের ওপর পড়েছে।
মব ভায়োলেন্স হচ্ছে, আমরা অস্বীকার করছি না। এটা নিয়ে আবার অনেকে অনেক কথা বলছেন। কিন্তু এটা কি বাংলাদেশে আগে ছিল না? সব বছরই ছিল। মনে আছে, স্কুলের সামনে একটি মহিলাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল? এখন এটা বৃদ্ধির অনেক কারণ রয়েছে। জুলাই-পরবর্তীতে মানুষের অনেক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, তারা যে বিচারটা চাচ্ছেন, সেটা নিজের হাতে নিতে চাচ্ছেন। খুব দ্রুত বিচারের চিন্তাভাবনা করছেন।
এটা নিয়ে আমাদের সমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রে বসা উচিত ছিল। ধরুন, মাজারে আক্রমণ হয়েছে— এটা ভালোভাবে তদন্ত করুন। বা গোয়ালন্দে যে আক্রমণ হয়েছে, সেখানে কারা কারা আক্রমণ করেছে? দেখবেন, অনেক রাজনৈতিক দলের কর্মী সেখানে ছিলেন। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ছয়-সাত দফা মিটিং (বৈঠক) করেছি। আমরা বলেছি, আপনারা প্রতিবাদ (প্রটেস্ট) করতে পারেন, কিন্তু ভায়োলেন্স (সহিংসতা) করবেন না। তারা তো আমাদের কথা শোনেননি। তারা লাশ তুলে এটাকে পুড়িয়ে দিয়েছে। এখানে দেখবেন, লিডিং রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছিলেন। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ছিল তাদের জনবলকে নিয়ন্ত্রণ করা। তৃণমূলে তো আমার কোনো রাজনৈতিক উইং নেই। সুতরাং এটা তাদের দায়িত্ব ছিল। তাদের বোঝা উচিত ছিল আমরা একটি টার্বুলেন্ট (অস্থির) সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
শফিকুল আলম : আমি মনে করি, অনেক ক্ষেত্রে তারা দায়িত্ব পালনে ফেইল করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর যে দায়িত্ব পালন করা উচিত ছিল, সেটা হয়নি। আরেকটা বিষয় হলো— জুলাই-পরবর্তী পরিস্থিতিতে পুলিশের আত্মবিশ্বাসও অনেক ক্ষেত্রে ছিল না। আপনি চাচ্ছেন পুলিশ যেন কোনোভাবেই গুলি না করে, টিয়ার গ্যাস (কাঁদানে গ্যাস) দিয়ে সরিয়ে দেয়। একটি থানায় ধরুন পুলিশ থাকে ৪০ থেকে ৫০ জন। পাশের থানা থেকে আনতে পারে আরও ৫০ থেকে ৬০ জন। এই ১৫০ জনের বিপরীতে যদি ১০ হাজার মানুষ দাঁড়ায়, তাহলে তারা তো পারে না। সেই ক্ষেত্রে পুলিশ কি গুলি করবে? গুলি করলে তো হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন (মানবাধিকার লঙ্ঘন)-এর প্রশ্ন আসে। ফলে আমরা পুলিশ পাঠালেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। পুলিশের আত্মবিশ্বাসও নেই। পুলিশের মধ্যে ভয় ঢুকে গেছে যে সবাই একত্রিত হয়ে যদি আমাকে মেরে ফেলে!
শফিকুল আলম : না। আমার মনে হয়, শুধু রাজনৈতিক দল নয়, এটা নিয়ে আমাদের পুরো সমাজের আরও নিবিড়ভাবে ভাবা দরকার ছিল। সেটা হয়নি। যতগুলো মাজারে আক্রমণ হয়েছে, এগুলো কারা করেছে, তাদের প্রোফাইল করুন। কারা কারা ছিল, অনেক ইন্টারেস্টিং তথ্য পাবেন। এদিকে, পুলিশের আত্মবিশ্বাস নেই। কেউ এসে মাজারে আক্রমণ করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করতে পারে, কিংবা অনেক ক্ষেত্রে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু তাতে তো কাজ হচ্ছে না। এই ধরনের ক্রাউড (ভিড়) ফেস করার জন্য একেক জায়গায় আমার দুই-তিন হাজার পুলিশ লাগবে। আমাদের কি এত পুলিশ আছে?
ঢাকায় যদি এমন পরিস্থিতি হয়, আমি কত পুলিশকে রাস্তায় মোবিলাইজ (মাঠে নামাতে) করতে পারব? পুলিশ ও এপিবিএন মিলিয়ে ১০ থেকে ১৫ হাজারের বেশি নয়। এখন যদি ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষের একটি মুভমেন্ট হয়, তাহলে তো পুলিশ হেল্পলেস (অসহায়)। এখানে আমাদের সবারই দায়িত্ব ছিল। আমাদের অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে, মাজারে আক্রমণ হয়েছে, যা খুবই ন্যক্কারজনক। আমরা প্রতিটি আক্রমণের নিন্দা জানাই।
এসব বিষয় নিয়ে সবাই মিলে বসে, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা যদি তাদের কর্মীদের বোঝাতেন, তাহলে আমরা আরও ভালোভাবে ম্যানেজ করতে পারতাম।
শফিকুল আলম : আপনি দেশের তিনটি বড় প্রোগ্রাম দেখেন। শরিফ ওসমান হাদির বড় জানাজা হলো, আমরা এটা সুচারুভাবে শেষ করেছি। এরপর তারেক রহমান আসলেন। সেখানেও রেকর্ড ব্রেকিং ক্রাউড (জনসমাগম) হয়েছে। সেটাও আমরা সুচারুভাবে শেষ করেছি। এরপর খালেদা জিয়ার জানাজা। ইতিহাসে এর চেয়ে বড় জানাজা আর হয়নি, এটাও আমরা সুচারুভাবে শেষ করেছি। মানুষের যেটা চাওয়া, অনেক কিছুই আমরা সেটা পূরণ করতে পেরেছি। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। সেটা দেখে মানুষ অনেক সময় রেগে যাচ্ছেন বা সমালোচনা করছেন। এতে আমাদের ভালো দিকটা তাদের চোখে আর পড়ছে না। যেকোনো দেশে ৩০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ জানাজায় গেলে সেটা ম্যানেজ করা একটি ম্যাসিভ (বিরাট) কাজ, অবিশ্বাস্য কাজ। ওসমান হাদির বিশাল জানাজা, তারেক রহমানের দেশে ফেরায় বিশাল জনসমাগম— এগুলো ম্যানেজ করা কি সহজ? একটু এদিক–সেদিক হলে তো সমস্যা হতো। একটি লোক যদি পদপিষ্ট হতো, তাহলে কী হতো? উন্নত দেশগুলোতেও এটা ম্যানেজ করা কঠিন।
শফিকুল আলম : এই রায় নিয়ে কূটনৈতিকভাবে যতগুলো কাজ করা যায়, আমরা সেগুলো করেছি। আমরা ভারতকে চিঠি দিয়েছি, যাতে তাদের এক্সট্রাডিশন (প্রত্যর্পণ) করা হয়। তাদের তরফ থেকে এখনও ফাইনাল কোনো সাড়া পাইনি। কিন্তু আমাদের আশা, তারা দুজনই একসময় ফিরবেন। তারা বিচারের সম্মুখীন হবেন। জাতি হিসেবে এটা আমাদের বলিষ্ঠ ডিটারমিনেশন (অঙ্গীকার)।
এত মানুষকে তারা খুন করেছে, তারা দুজনই কসাই। তাদের আইনের সামনে আনতেই হবে, বিচার করতেই হবে। এছাড়া আরও অনেকের বিরুদ্ধে কেস (মামলা) চলছে। যার বিরুদ্ধেই কেস আছে, যদি তারা কনভিকশন (দোষীসাব্যস্ত) হয়, বিদেশে থাকলেও আমরা অবশ্যই তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব। এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আমাদের সরকারের আর প্রায় ৪০ দিন আছে। আমাদের পরে যারা আসবে, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস সেই সরকারেরও মূল ফোকাস থাকবে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালসহ যেসব কনভিকটেড (দণ্ডপ্রাপ্ত) হয়েছেন বা হবেন, সেই খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা।
শফিকুল আলম : শেখ হাসিনার রায়, তার কনভিকশন (দোষীসাব্যস্তকরণ), তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া খুবই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়েছে। এটা আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল (আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার আদালত) আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট মেনে তার ট্রায়াল করেছে। সেই অনুযায়ী তার কনভিকশন হয়েছে। তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। যারা এটাকে ইগনোর করছেন, আমি বলব তারা আসলে স্বৈরাচারের হাতকে শক্তিশালী করছেন। শেখ হাসিনার ক্রাইম একদম দিবালোকের মতো স্পষ্ট ছিল।
শফিকুল আলম : আমি এটা বলছি না। কিন্তু এটা দিবালোকের মতো হয়েছে। এটাকে ইগনোর করার কিছুই নেই। এটা কারা ইনভেস্টিগেট (তদন্ত) করেছে? এটা ইনভেস্টিগেট করেছে ইউএন (জাতিসংঘ)। তারা ১২৭ পাতার প্রতিবেদনও দিয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে লেখা আছে, তিনি (শেখ হাসিনা) অর্ডার দিচ্ছেন এই কিলিংয়ের। এখানে কোনো ‘ইফ অ্যান্ড বাট’ নেই। এরপরও তারা যদি এটাকে ইগনোর করে, তাহলে তারা সাংবাদিক কি না, এটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। সাংবাদিক তো সত্যের পক্ষে থাকবে। আপনার একটা পছন্দের দল থাকতে পারে। এই দলকে পছন্দ করছেন, অন্য দলকে অপছন্দ করছেন— এমন হতেই পারে। কিন্তু খুনিকে ডিফেন্ড (রক্ষা/সমর্থন) করা, এটা অবিশ্বাস্য। এটা পৃথিবীতে কেউ করে না। হিটলারকে কি কেউ ডিফেন্ড করেছে? এটা কেউ দেখেছে? এটা তো সম্ভব না। যদি কেউ করে, তাহলে তার ক্যারিয়ার থাকে না। ওয়েস্টার্ন কোনো দেশে কেউ হিটলারকে পাবলিকলি প্রেস (সার্বজনীনভাবে প্রকাশ) করে, তার চাকরিই থাকবে না। সে যেখানেই চাকরি করুক না কেন। সাংবাদিক হলেও চাকরি থাকে না। অথচ আমাদের এখানে ১০২ জন বিবৃতি দিয়েছে। তাহলে বোঝেন, তারা কতটা দোসর ছিল।




