ঈদযাত্রা শুরু : সড়ক-রেল-নৌপথে বিশেষ প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা শুরু হচ্ছে আজ শনিবার (২৩ মে)। ঈদ সামনে রেখে সড়ক, রেল ও নৌপথে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আজকের যাত্রার অগ্রিম টিকিটও ১০ দিন আগে থেকে বিক্রি করা হয়েছে।

রেলপথে ভোর ৬টায় ঢাকা থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদযাত্রা শুরু হয়। একই সময় থেকে বিআরটিসি ও বেসরকারি পরিবহনের বাস বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায়। রাজধানীর সদরঘাট থেকেও নির্ধারিত সময়ে দেশের বিভিন্ন রুটে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে।

ঈদ উপলক্ষ্যে গত ১৭ মে থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করছে বাংলাদেশ রোড Transport করপোরেশন (বিআরটিসি)। ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি কমাতে আজ থেকে বিআরটিসির ‘ঈদ স্পেশাল সার্ভিস’ চালু হয়েছে।

বিআরটিসির অপারেশন বিভাগ জানিয়েছে, রাজধানীর মতিঝিল, জোয়ারসাহারা, কল্যাণপুর, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন ডিপো থেকে যাত্রীরা টিকিট সংগ্রহ করেছেন। এসব ডিপো থেকে রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল করবে।

এ ছাড়া গ্রিন লাইন পরিবহন, সোহাগ পরিবহন প্রাইভেট লিমিটেড, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সৌদিয়া কোচ সার্ভিস, সেন্টমার্টিন পরিবহন ও দেশ ট্রাভেলসসহ প্রায় সব বেসরকারি পরিবহন কোম্পানিও অগ্রিম টিকিট বিক্রি করেছে। আজ থেকেই এসব পরিবহনের ঈদযাত্রা শুরু হচ্ছে।

ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে সড়কপথে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে আগামী ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মহাসড়কে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। তবে পশুবাহী যানবাহন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, পচনশীল দ্রব্য, তৈরি পোশাক, ওষুধ, সার ও জ্বালানি বহনকারী যানবাহন এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।

মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে কোনো যানবাহন পার্কিং না করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে সমিতি থেকে। পাশাপাশি পণ্য ও পশুবাহী যানবাহনে, বিশেষ করে ফিরতি পথে, যাত্রী পরিবহন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

ঈদ সামনে রেখে দেশের সাতটি প্রধান মহাসড়কে যানজটপ্রবণ ৯৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এসব এলাকায় ঈদের আগে ও পরে নিবিড় মনিটরিং করা হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর: ২৫টি করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান (সবচেয়ে বেশি), ঢাকা-সিলেট: ২১টি স্পট, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার: ৮টি স্পট, ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-ময়মনসিংহ: ৭টি করে স্পট, ঢাকা-বরিশাল: ১টি স্পট

মেঘনা টোলপ্লাজা, যমুনা সেতু টোল এলাকা, কাঞ্চন সেতু, কাঁচপুর, বাইপাইল, নবীনগর ও গাজীপুর চৌরাস্তা।

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে টোলপ্লাজা ও যানজটপ্রবণ এলাকায় ঈদের সাত দিন আগে থেকে ঈদের তিন দিন পর পর্যন্ত বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় থাকবে পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু, মেঘনা সেতু, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও হানিফ ফ্লাইওভারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো।

하이ওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মুনতাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সড়ক মেরামত, সংকীর্ণতা, টোলপ্লাজায় অতিরিক্ত চাপ ও বিকল যানবাহনের কারণে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। তবে আগাম পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

ঈদের আগের যাত্রার সব অগ্রিম টিকিট ইতোমধ্যে বিক্রি শেষ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে এবারও সব অগ্রিম টিকিট অনলাইনে বিক্রি করা হয়েছে। ভোর ৬টায় রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস (৭৬৯) ঢাকা স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিশেষ ট্রেনযাত্রা। ২৩ মে প্রথম প্রহর রাত ১২টার পর থেকে সব ট্রেন বিশেষ ব্যবস্থায় চলছে।

এবার ঈদে ঢাকা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঁচ দিনে মোট ২১৮টি ট্রেন ছেড়ে যাবে। গড়ে দিনে ৪৩টি ট্রেন ঢাকা ছাড়বে। ঈদের আগে পাঁচ দিনে ঢাকা থেকে ট্রেনের সব শ্রেণি মিলিয়ে মোট আসন রয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৮৭টি। এর সঙ্গে যাত্রার দিন আরও ২৫ শতাংশ যাত্রী স্ট্যান্ডিং টিকিটে ভ্রমণ করবেন। ফলে দিনে গড়ে প্রায় ৩৯ হাজার ৭৯৬ জন বৈধভাবে ট্রেনে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।

বরাবরের মতো এবারও বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী পথ তৈরি করা হয়েছে ঢাকা, বিমানবন্দর ও জয়দেবপুর রেলস্টেশনে।

সেখানে আজ থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ একাধিক ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনার (টিটিই) দায়িত্ব পালন করবেন।

যাত্রীদের টিকিট ও জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে স্টেশনে প্রবেশ করতে হবে। এ কারণে ভ্রমণের সময় টিকিটের পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার অনুরোধ জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

একই সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে স্টেশনে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য স্টেশনের প্রবেশমুখে র‌্যাব, বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও পুলিশের কন্ট্রোল রুম বসানো হয়েছে।

ঈদুল আজহায় ঘরমুখো মানুষের যাত্রা সহজ করতে ১০টি বিশেষ ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামীকাল রোববার (২৪ সে) থেকে ঈদের আগে ও পরে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এসব ট্রেন চলাচল করবে।

ট্রেনের নাম রুট চলাচলের সময়সূচি
চাঁদপুর ঈদ স্পেশাল-১ ও ২ চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম ২৫ মে থেকে ঈদের আগের দিন এবং ঈদের ২য় দিন থেকে ১ জুন পর্যন্ত।
তিস্তা ঈদ স্পেশাল-৩ ও ৪ ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা ২৫ মে থেকে ঈদের আগের দিন এবং ঈদের ২য় দিন থেকে ১ জুন পর্যন্ত।
পার্বতীপুর ঈদ স্পেশাল-৯ ও ১০ জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর ঈদের আগে ২৪ থেকে ২৬ মে এবং ঈদের পরের দিন থেকে পরবর্তী ৩ দিন।
শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৫ ও ৬ ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার শুধু ঈদের দিন।
শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৭ ও ৮ ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ শুধু ঈদের দিন।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় ব্যবস্থাপক এ বি এম কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, যাত্রীরা যেন সুশৃঙ্খলভাবে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে পারেন, সে জন্য নির্দিষ্ট যাত্রী কিউ ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। কোনো বহিরাগত যাতে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য তল্লাশি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। পার্কিং এলাকায় যাতে যানজট না হয়, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ঈদুল আজহা সামনে রেখে নৌপথে যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ নির্দেশনা ও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

যাত্রীদের অতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে চলা, লঞ্চের ছাদে না ওঠা, তাড়াহুড়া না করা এবং খারাপ আবহাওয়ায় নৌভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারে চলন্ত বা নোঙর করা লঞ্চে ট্রলার বা নৌকা থেকে সরাসরি যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে ministry। শুধু বিআইডব্লিউটিএ নির্ধারিত টার্মিনাল পন্টুন ব্যবহার করেই যাত্রী ওঠানামা করা যাবে। সদরঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাটে সার্বিকভাবে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড নিয়োজিত থাকবে। নিয়ম ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট লঞ্চের যাত্রা বাতিল ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এমভি নড়িয়া-৭: পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে শিমুলিয়া-চাঁদপুর-ঈদগাহ রুটে সকাল ৭টায় চলাচল করবে।

শিমুলিয়া-হরিণা-ইলিশা রুটে সকাল ৮টায় পরিচালিত হবে। বিআইডব্লিউটিএ হটলাইন: ১৬১১৩. জাতীয় জরুরি সেবা: ৯৯৯, কোস্ট গার্ড: ১৬১১১

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন:

“সড়কে ঘরমুখো প্রায় দেড় কোটির ওপরে মানুষ। এবার আরও ১ কোটির কাছাকাছি কোরবানি পশু, এটাও তো পরিবহনের ব্যাপার। প্রায় আড়াই কোটি মানুষ এবং কোরবানির পশুকে মাত্র তিন-চার দিনের মধ্যে স্বস্তির ও নির্বিঘ্ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের যে অবকাঠামো, বাস-ট্রাক যানবাহন আছে, এটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। চ্যালেঞ্জগুলো আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি। আপনাদের সবার সহযোগিতা থাকলে, জনগণ সচেতন হলে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ যদি না হয় তাহলে আমার মনে হয় মানুষের স্বস্তিতে এবার ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে পারব।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button