যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চলমান সংঘাতে মধ্যস্থতার দায়িত্ব এতদিন অনেকটা এককভাবে পাকিস্তান পালন করে এলেও এবার এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার। এর অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার তেহরান সফর করেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে আপাতত আর আগ্রহী নয় ওয়াশিংটন। গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামের নতুন অর্থনৈতিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন। ওই দিন হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ট্রাম্প বলেন, “আমরা তাদের (ইরান) সঙ্গে আর কথা বলতে চাই না। ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে বৈঠক বা এ জাতীয় কোনো কিছুর পরিকল্পনাও আমাদের নেই।”
তবে আলোচনার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ করেননি ট্রাম্প। তিনি যোগ করেন, “আমরা চাই, ইরান একটি ফলপ্রসূ আলোচনার সিদ্ধান্ত নিক। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন আমাদের এই অর্থনৈতিক অভিযান চলবে।”
উল্লেখ্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী। প্রায় ৬ মাস ধরে চলা এই সংঘাতে মার্কিন ও ইরানি বাহিনী পরস্পরকে লক্ষ্য করে অভিযান ও পাল্টা অভিযান চালিয়েছে। এর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও পরবর্তীতে তা ভেঙে যায় এবং উভয়পক্ষ আবারও সংঘর্ষে জড়ায়। তবে ২৪ আগস্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণার ঠিক আগেই ট্রাম্প জানান যে, সামরিক অভিযਾਨ পরিচালনার পরিবর্তে ওয়াশিংটন এখন ইরানের অর্থনীতির ওপর সীমাহীন চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছে।
এমন এক পরিস্থিতিতে তেহরান সফর করলেন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুলরহমান আল-থানি। মার্কিন অর্থনৈতিক অভিযান ঘোষণার চার দিন পর তেহরানে পৌঁছে তিনি ইরানের শীর্ষ আলোচক এবং ক্ষমতাসীন সরকারের অন্যতম মুখপাত্র মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কাতার প্রধান ইরানকে পুনরায় কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানান।
আল-থানির এই আহ্বানের জবাবে ঘালিবাফ শর্ত দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলা সম্পূর্ণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, তবেই তেহরান ফের কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতে পারে।
আল-থানি ও ঘালিবাফের এই বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নির্বাহী প্রধান মেজর জেনারেল মোহসিন রেজায়িও উপস্থিত ছিলেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান শিগগিরই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই আলোচনা করতে চায়, তবে তা ইরানের হরমুজ বিষয়ক পদক্ষেপ গ্রহণের আগেই শুরু করতে হবে। পাশাপাশি, আলোচনার নামে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ষড়যন্ত্র করলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে কঠোর হামলা চালানো হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান এই যুদ্ধের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বিদেশি জাহাজগুলো থেকে টোল আদায়ের ঘোষণা দিয়েছিল ইরান। দেশটির এমন পদক্ষেপে গুরুতর আপত্তি জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনবিরোধী বলে আখ্যায়িত করে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও এ বিষয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেয়।
তেহরান সফর শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী আল থানি জানান, তেহরানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ ও নৌযানের মুক্ত চলাচলের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি, প্রণালির মধ্য দিয়ে একটি অস্থায়ী যৌথ ইরান-ওমানি নৌ-পরিবহন করিডোর স্থাপন এবং মাইন অপসারণের একটি যৌথ প্রকল্প নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে হোয়াইট হাউসের বিদায়ী প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন উপযুক্ত সময় মনে করবেন, কেবল তখনই ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হতে পারে, তার আগে নয়। তিনি আরও বলেন, “আমরা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে তাদের সামরিক শক্তিকে ধ্বংস করেছি। এখন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শুরু হয়েছে এবং এই অভিযান চলমান থাকবে। বর্তমানে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না এবং প্রেসিডেন্ট উপযুক্ত সময় নির্ধারণ না করা পর্যন্ত কোনো কূটনৈতিক সংলাপ হবে না।”
(সূত্র: রয়টার্স)

মন্তব্য করুন
মন্তব্য সমূহ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!