ব্যায়াম গর্ভাবস্থার একটি কার্যকরী অংশ হতে পারে, যদি গর্ভাবস্থা জটিলতামুক্ত থাকে এবং সেটি হবু মায়ের জন্য উপযুক্ত হয়। হাঁটা, সাঁতার, প্রসবপূর্ব যোগব্যায়াম এবং অন্যান্য মাঝারি ধরনের কার্যকলাপ ফিটনেস এবং সার্বিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু গর্ভাবস্থা শারীরিক পরিশ্রমের প্রতি শরীরের প্রতিক্রিয়াকেও পরিবর্তন করে দেয়।
কিছু অস্বস্তি স্বাভাবিক হতে পারে, আবার কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণের জন্য অবিলম্বে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, ব্যায়ামের সময় আপনি ক্লান্ত বোধ করছেন কি না তা নয়, বরং আপনার শরীর এমন কোনো সতর্ক সংকেত দিচ্ছে কি না যার অর্থ আপনার থেমে যাওয়া উচিত। জেনে নিন গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম বন্ধ করার লক্ষণ-
১. যোনিপথে রক্তপাত বা তরল নিঃসরণ
ব্যায়ামের সময় বা পরে যোনিপথে রক্তপাতকে ব্যায়ামের স্বাভাবিক অস্বস্তি হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। যোনি থেকে তরল নিঃসরণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এটি ঝিল্লি ফেটে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে এবং এর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। এরকমটা ঘটলে অবিলম্বে ব্যায়াম বন্ধ করে আপনার প্রসূতি দল বা ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (ACOG) গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম বন্ধ করার সতর্কীকরণ চিহ্নগুলোর মধ্যে যোনিপথে রক্তপাত এবং তরল নিঃসরণকে তালিকাভুক্ত করেছে।
২. মাথা ঘোরা, মাথা হালকা লাগা বা জ্ঞান হারানো
ব্যায়ামের পরে সামান্য ক্লান্ত বোধ করা স্বাভাবিক। কিন্তু মাথা ঘোরা, জ্ঞান হারানোর অনুভূতি বা অস্বাভাবিকভাবে মাথা হালকা লাগা একটি ভিন্ন বিষয়। গর্ভাবস্থায় এমনিতেই রক্ত সঞ্চালনে পরিবর্তন আসে। ব্যায়াম রক্তচাপ এবং রক্ত প্রবাহকে আরও প্রভাবিত করতে পারে।
জ্ঞান হারানোর অনুভূতি হওয়া সত্ত্বেও ব্যায়াম চালিয়ে গেলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। থামুন, নিরাপদে বসুন বা শুয়ে পড়ুন এবং আপনার উপসর্গগুলো শান্ত হতে দিন। যদি মাথা ঘোরা তীব্র, দীর্ঘস্থায়ী হয় বা ব্যায়ামের সময় বারবার হতে থাকে, তবে আপনার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
৩. বুকে ব্যথা বা অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট
ব্যায়ামের সময় হালকা শ্বাসকষ্ট হওয়া স্বাভাবিক, বিশেষ করে গর্ভাবস্থা যত বাড়তে থাকে। কিন্তু হঠাৎ বা তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে তা উপেক্ষা করে ব্যায়াম করা উচিত নয়। বুকে ব্যথা আরেকটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত। এই উপসর্গগুলোর বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে এবং এর জন্য সরাসরি গর্ভাবস্থা বা শারীরিক দুর্বলতাকে দায়ী করা উচিত নয়।
৪. ব্যায়ামের সময় নিয়মিত বা বেদনাদায়ক সংকোচন
গর্ভাবস্থায় পেট মাঝে মাঝে শক্ত হতে পারে। তবে নিয়মিত, বেদনাদায়ক বা ক্রমশ ঘন ঘন সংকোচন হওয়া ভিন্ন বিষয়। ব্যায়াম বন্ধ করার পরেও যদি সংকোচন চলতে থাকে, আরও তীব্র হয় বা নিয়মিত বিরতিতে হয়, তাহলে আপনার ডাক্তার বা প্রসূতি বিভাগে যোগাযোগ করুন। ৩৭ সপ্তাহের আগে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নিয়মিত সংকোচন অকাল প্রসবের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জটিলতাহীন গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম নিজে থেকে অকাল প্রসবের ঝুঁকি নিয়মিতভাবে বাড়ায় বলে প্রমাণিত হয়নি। ২০২৩ সালে J Clin Med-এর একটি পর্যালোচনায় ৫৭টি গবেষণার ভিত্তিতে দেখা গেছে যে, গর্ভাবস্থায় মাঝারি ধরনের ব্যায়ামের সঙ্গে গর্ভকালীন বয়স কমে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ব্যায়ামের সঙ্গে অকাল প্রসবের ঝুঁকি বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক নেই।
৫. শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া
গর্ভাবস্থা যত এগোতে থাকে, শিশুর নড়াচড়ার ধরণ মায়ের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। ব্যায়াম করার সময় বা পরে যদি আপনি আপনার শিশুর স্বাভাবিক নড়াচড়ায় স্পষ্ট হ্রাস বা অনুপস্থিতি লক্ষ্য করেন, তবে এটা ভাববেন না যে আপনি ব্যায়াম করেছেন বলে শিশুটি কেবল বিশ্রাম নিচ্ছে।
ব্যায়াম করা বন্ধ করুন এবং নড়াচড়ার ধরণে মনোযোগ দিন। যদি নড়াচড়া লক্ষণীয়ভাবে কমে যায়, তবে অবিলম্বে আপনার ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এটি এমন পরিস্থিতি নয় যেখানে নড়াচড়া ফিরে আসে কি না তা দেখার জন্য ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত।
৬. তীব্র মাথাব্যথা বা হঠাৎ ফোলাভাব
ব্যায়ামের সময় হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা হলে, তাকে পানিশূন্যতা বা ক্লান্তি বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। মুখ বা হাতে হঠাৎ ফোলাভাব, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, পেটের উপরের অংশে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি দেখা দিলে সতর্ক হোন। এগুলো প্রি-এক্লাম্পসিয়ার সতর্কীকরণ চিহ্ন হতে পারে, যা গর্ভাবস্থার একটি জটিলতা এবং এর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।