

মোঃ ইব্রাহিম, ঢাকা: উত্তরায় বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহত ২০, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৭১, উৎসুক জনতার ভিড়ে বেগ পেতে হয় উদ্ধারকর্মীদের রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় এ পর্যন্ত ২০ জন নিহতের খবর পাওয়া। আর বিভিন্ন হাসপাতালে এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন ১৭১ জন। তবে উৎসুক জনতার ভিড়ে উদ্ধারকাজে করতে বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের।
আজ সোমবার (২১ জুলাই) বিকেলে আইএসপিআর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ২০ জন এবং আহত হয়েছেন ১৭১ জন।
এর আগে আজ দুপুর ১টার পর রাজধানীর উত্তরায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়। বিমানটি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গে বিমানটিতে আগুন ধরে যায় এবং যে ভবনে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় সেখানও আগুন লেগে যাায়। ভবনটি অনেক প্রথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ছিল বলে জানা গেছে। যাদের বেশিরভাগই হতাহত হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। উত্তরাসহ আশপাশের ফায়ার সার্ভিস ৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হতাহতদের উদ্ধার কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় সেনাবাহিনী ও বিজিবি। পরে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে হতাহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দুর্ঘটনার পর থেকেই ঘটনাস্থলে আসতে থাকেন হতাহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা। এ সময় তাঁদের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে স্কুল চত্বর।
প্রত্যক্ষদর্শী ও মেট্রোরেলের টেকনিশিয়ান মেহেদী হাসান যুগান্তরকে বলেন, একটি বিমান হঠাৎ করে মাইলস্টোন স্কুলের বিল্ডিংয়ের ওপর পড়ে যায়। সাথে সাথে সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে। আর সেখান বাচ্চাদের চিৎকার শুনতে পাই। দ্রুত ঘটনা স্থালে গিয়ে দেখি বাচ্চাদের ক্লাস রুমের ভেতর বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। অনেক ছাত্র-ছাত্রী সাথে সাথে আগুনে পুড়ে মারা যায়। আবার অনেকেই আহত অবস্থায় চিৎকার-চেঁচামেচি করতে থাকেন।
মাইলস্টোন কলেজের কয়েকজন কর্মচারী যুগান্তরকে বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে থেকে যাকে যেভাবে পরেছি উদ্ধার করে কলেজ বাসে করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়েছি। আমাদের চোখের সামনে এই কোমলমতি শিক্ষার্থী গুলো পোড়ে মারাযাচ্ছে সে দৃশ্য আমরা সয়তে পারছে না।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুর্ঘটনার পর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ির স্থায়ী ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকায় সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল উৎসুক জনতার ভিড়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে প্রবেশের মূল ফটকসহ দিয়াবাড়ির গোলচত্বরে বহুমানুষকে ভিড় জমে আছে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আশপাশেই নয়, উত্তরার হাউসবিল্ডিং থেকে দিয়াবাড়ি সড়ক ও আশপাশের সড়কেও ছিল লোকে লোকারণ্য। যার কারণে জরুরি সেবায় নিয়োজিত অ্যাম্বুলেন্স, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ঘটনাস্থলে প্রবেশ ও বের হতে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হতে দেখা যায়।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, রাস্তা থেকে উৎসুক জনতাকে সরে যেতে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীরা বারবার অনুরোধ করছেন।
উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের কর্তব্যরত এক কর্মকর্তারা জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর অতি উৎসাহী লোকজন গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থেকে কাজের বিঘ্ন ঘটিয়েছেন। পানি শেষ হওয়ার পর ফের পানি আনার জন্য যেতেও প্রচুর বেগ পোহাতে হয়েছে।
কর্তব্যরত সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানান, আমরা আমাদের সাধ্যমতো উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু উৎসুক জনতার অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে আমাদের কাজে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তাদের সরে যেতে বারবার অনুরোধ করলেও তারা অন্যদিকে গিয়ে আবার ভিড় জমাচ্ছে। যার কারণ উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে আসতে ও যেতে সমস্যার সমক্ষিণ হয়েছে। সেই সঙ্গে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধারের পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার রাস্তাও ব্লক হয়ে আছে। তাই মেট্রোরেলের গেট খুলে ভেতর দিয়ে আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।
এদিকে, সোমবার বিকেলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েন, রাজধানীর ছয়টি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১৬৪ জন। আর নিহত হয়েছে ১৯ জন।
আইএসপিআর আরও জানায়, কয়েকটি হাসপাতালে আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন এর মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল: আহত ৮ জন, । জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট-আহত ৭০ জন। ঢাকা মেডিকেল-আহত: ৩। সিএমএইচ (ঢাকা)-আহত ১৭। কুর্মিটোলা জেনারেল হসপিটাল-আহত ১। লুবনা জেনারেল হাসপাতাল-আহত:-১১। উত্তরা আধুনিক হসপিটাল-নিহত ১। উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতাল- আহত: ১।
আইএসপিআর জানায়, হাসপাতালে গিয়ে নিহত হয়ে হয়েছেন- কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল: নিহত নেই। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট- নিহত ২। ঢাকা মেডিকেল-নিহত ১। সিএমএইচ (ঢাকা)- নিহত ১২। কুর্মিটোলা জেনারেল হসপিটাল- নিহত ২। লুবনা জেনারেল হাসপাতালে- নিহত: ২। উত্তরা আধুনিক হসপিটাল-নিহত ১। উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতাল-নিহত নেই।
এই ৮ হাসপাতালে মোট আহত হয়ে চিকিৎসাধীন ১৭১ জন। আর নিহত হয়েছেন ২০ জন।
আইএসপিআর আরও জানায়, দুর্ঘটনা মোকাবিলায় এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বিমানের বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম বিমানটিকে ঘনবসতি এলাকা থেকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিমানটি ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল এবং কলেজের দোতালা একটি ভবনে অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়েছে।
আরেকটি বার্তায় আইএসপিআর জানায়, বিভিন্ন হাসপাতালে রক্তদাতাদের পাঠাতে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর রেকর্ড অফিসে একটি জরুরি সেল (২৪/৭) খোলা হয়েছে; মোবাইল-০১৭৬৯৯৯৩৫৫৮ (হোয়াটসঅ্যাপ) নম্বরে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করা হলো।
এছাড়া এখনো যে সকল অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের খুজছেন তাদের মধ্যে বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন, শামীম ইউসুফ (১৪), মাহিন (১৫), আবিদ (১৭), রফি বড়ুয়া (২১), সায়েম (১২), সায়েম ইউসুফ (১৪), মুনতাহা (১১), নাফি () মেহেরিন(১২), আয়মান (১০), জায়েনা (১৩), ইমন(১৭), রোহান (১৪), আবিদ (৯), আশরাফ (৩৭), ইউশা (১১), পায়েল (১২), আলবেরা (১০), তাসমিয়া (১৫), মাহিয়া (), অয়ন (১৪), ফয়াজ (১৪), মাসুমা (৩৮), মাহাতা (১৪), শামীম, জাকির (৫৫), নিলয় (১৪), সামিয়া।
অভিভাবকদের অন্য কোথাও না খুঁজে সরাসরি জাতীয় বার্ন ইউনিটে চলে যাওয়া পরামর্শ দিচ্ছেন আইন শৃংখলা বাহিনী।




