

আব্দুল আলিম, নাটোর জেলা প্রতিনিধি: সরকারি নীতিমালা তোয়াক্কা না করে এবং সীমান্তবর্তী অবস্থানের সুযোগ নিয়ে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আওতাধীন এলাকার হাজার হাজার মেট্রিক টন আখ অবৈধভাবে সংগ্রহ করছে নাটোর সুগার মিল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই ‘আখ পাচার’ উৎসব চলছে। এতে দুই মিলের প্রকৃত কৃষকরা ন্যায্য অধিকার ও পুর্জি থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
গত ৯ ও ১০ জানুয়ারি নাটোর সুগার মিলের জয়ন্তীপুর, তামালতলা, মালঞ্চি এবং নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আব্দুলপুর ও সালামপুর ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্রে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালানো হয়। দেখা যায়, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল এলাকার আখ নাটোর সুগার মিলের কৃষকদের নামে ইস্যুকৃত ‘পুর্জি’ ব্যবহার করে মিলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
একাধিক গোপন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, প্রতি গাড়ি আখের বিপরীতে দালালচক্র ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছে। কাগজে-কলমে নাটোরের কৃষকের আখ দেখানো হলেও বাস্তবে সেই আখ আসছে নর্থ বেঙ্গলের চাষিদের কাছ থেকে।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, “আমাদের মিল এলাকায় প্রায় দুই লক্ষ মেট্রিক টন আখ রয়েছে। মিলের সক্ষমতা কম হওয়ায় কৃষকদের পর্যাপ্ত পুর্জি দেওয়া যাচ্ছে না। এই সুযোগে দালালরা আমাদের আখ অন্য মিলে পাচার করছে। এতে মিলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি ঋণ অনাদায়ী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।”
অন্যদিকে, নাটোর সুগার মিল এলাকার কৃষকদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তারা বলেন, “আমাদের নিজের জমির আখ এখনও মাঠে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ আমাদের পুর্জি না দিয়ে দালালদের মাধ্যমে অন্য এলাকার আখ কেনা হচ্ছে।”
অভিযোগের বিষয়ে জয়ন্তীপুর খামাসের সিআইসি মুনসুর নতুন যোগদানের দোহাই দিয়ে বলেন, “নর্থ বেঙ্গলের কিছু আখ আমাদের চাষীদের নামেই আসে, এটা আলাদা করা মুশকিল।”
নাটোর সুগার মিলের জিএম (কৃষি) ফেরদৌস আলম দাবি করেন, বর্ডার এলাকা হওয়ায় কিছু আখ এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন নাটোর সুগার মিলের এমডি আখলাসুর রহমান। তিনি অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে বলেন, “যারা আখ নিচ্ছে বা দিচ্ছে, তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিন।”
অনুসন্ধানী মহলের প্রশ্ন— যথাযথ তদারকি ব্যবস্থা ও ডিজিটাল পুর্জি থাকা সত্ত্বেও দালালরা কীভাবে পুর্জি সংগ্রহ করছে? সীমান্তবর্তী ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্রগুলোতে কেন কোনো নজরদারি নেই?
বিপন্ন কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনের দাবি: ১. অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন। ২. ডিজিটাল পুর্জি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ৩. সীমান্ত এলাকায় অবৈধ আখ কেনাবেচা বন্ধে কঠোর নজরদারি। ৪. চিহ্নিত দালালচক্র ও মদদদাতা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা।
দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সরকারি মিল, প্রান্তিক কৃষক এবং রাষ্ট্র—তিন পক্ষই দীর্ঘমেয়াদী লোকসানের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।




