খাগড়াছড়ির পাহাড়ে আগুন : প্রতিবছর ধ্বংস হচ্ছে লাখো বন্যপ্রাণী-উদ্ভিদ

জেলা প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়ি জেলার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে আগুনের লেলিহান শিখায় ছাই হয়ে যাচ্ছে অগণিত বন্যপ্রাণী ও দুর্লভ উদ্ভিদ। জুম চাষের প্রস্তুতি, বাগান পরিষ্কার কিংবা অসতর্কতার ফলে লাগানো এই আগুন মুহূর্তেই গ্রাস করছে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে পার্বত্য এই অঞ্চল।

বর্তমানে খাগড়াছড়িতে শুষ্ক মৌসুম চলায় পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে আগুনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা জানান, জুম চাষের জন্য পাহাড়ের ঝোপঝাড় পুড়িয়ে পরিষ্কার করার ঐতিহ্যগত পদ্ধতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে মাটিতে বসবাসকারী সাপ, ব্যাঙ, গিরগিটি ও ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণী পালানোর সুযোগ পায় না। বিশেষ করে এখন পাখিদের ডিম পাড়ার মৌসুম হওয়ায় আগুনে পুড়ে নষ্ট হচ্ছে বনমোরগ, ঘুঘু ও শালিকসহ অসংখ্য বুনো পাখির বাসা ও প্রজননচক্র।

পরিবেশবিদদের মতে, আগুনের তাপে পাহাড়ের উর্বর মাটির ওপরের স্তর (Topsoil) পুড়ে যায়। এতে মাটির জৈব উপাদান ও উপকারী অণুজীব ধ্বংস হয়ে উর্বরতা কমে যাচ্ছে। গাছপালা ও ঝোপঝাড় না থাকায় বৃষ্টির সময় দ্রুত পানি নেমে আসে, ফলে শুকিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ছড়া ও ঝরনা। শিকড়হীন আলগা মাটি ধুয়ে আসায় বাড়ছে পাহাড় ধসের ঝুঁকিও।

যাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, “সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আগুনের ফলে আগের মতো আর জীববৈচিত্র্য দেখা যায় না। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই বিনাশী কাজ রোধ করা সম্ভব নয়।”

খাগড়াছড়ি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফরিদ মিঞা জানান, জুম চাষের ক্ষেত্রে আগুন না লাগিয়ে শুধু আগাছা পরিষ্কার করে চাষাবাদ করলে ক্ষতি অনেকটা কমানো সম্ভব। বন বিভাগ এ বিষয়ে স্থানীয়দের সচেতন করতে নিয়মিত সভা করছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, “পাহাড়ের রিজার্ভ ফরেস্টগুলো রক্ষায় আমরা বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছি। বানরসহ বন্যপ্রাণীরা খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসছে, যা পাহাড়ের খাদ্য সংকটকেই নির্দেশ করে। বর্তমান সরকারের সময়ে নতুন করে এক লাখ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।”

পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের মতে, পাহাড়ের এই প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করতে হলে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর আইনি প্রয়োগ জরুরি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button