উনুনে আগুন জ্বলবে কি না, ঠিক করে দেয় ভোরের রাজপথ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোর ৬টা। হাতে কোদাল আর চোখে একরাশ অনিশ্চয়তা নিয়ে নতুনবাজার মোড়ের ফুটপাতে বসে আছেন সাজল মিয়া। আজ ১ মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। সারা বিশ্বে যখন শ্রমিকের অধিকারের কথা বলা হচ্ছে, সাজল মিয়ার চিন্তা তখন অন্য জায়গায়—আজ কাজ জুটবে তো? কাজ জুটলে উনুনে আগুন জ্বলবে, না হলে পরিবারকে কাটাতে হবে আধপেটা খেয়ে।

রাজধানীর নতুনবাজার, বাড্ডা বা কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে প্রতিদিন ভোরে জমে ওঠে মানুষের শ্রম বিক্রির হাট। এখানে রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি থেকে শুরু করে মাটি কাটার শ্রমিক—সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন একটি ‘কাজের ডাক’-এর আশায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় সাজল মিয়ার মতো শত শত শ্রমিকের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।

নেত্রকোনার সাজল মিয়া ১২ বছর ধরে ঢাকায় দিনমজুরি করছেন। সাতজনের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। টানা এক সপ্তাহ কোনো কাজ পাননি। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “কাজ না থাকলে একবেলা খেলে দুবেলা উপোস থাকতে হয়। ধারদেনা করে কোনোমতে টিকে আছি।”

নোয়াখালীর সোলাইমান মেসের খরচ বাঁচিয়ে পরিবারকে টাকা পাঠান। কিন্তু দালালদের দৌরাত্ম্য আর অনিয়মিত কাজে তার সংসার এখন ভাঙনের মুখে। তিনি বলেন, “লজ্জায় সব কথা বলতে পারি না, আমাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই।”

 নিঃসন্তান রোকেয়া স্বামী হারানোর পর এই শ্রমবাজারেই নিজের ভাগ্য খুঁজছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মজুরি না বাড়ায় তার জীবন এখন কাটছে চরম অভাব-অনটনে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, হাড়ভাঙা খাটুনি করলেও ন্যায্য মজুরি তাদের হাতে পৌঁছায় না। মাটি কাটার মজুরি ৮০০ টাকা হলেও সরদার বা মধ্যস্বত্বভোগীরা ২০০ টাকা কেটে নেন। প্রতিবাদ করলে কাজ হারানোর ভয়ে তারা মুখ খুলতে পারেন না।

মে দিবস উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকলেও এই শ্রমজীবী মানুষদের জীবনে বিশ্রামের কোনো অবকাশ নেই। কারওয়ান বাজারের সেলিম হোসেন জানান, অসুস্থ হলেও তাকে কাজে বের হতে হয়। কারণ, একদিন কাজ না করলে খাবার জোটে না।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশের শ্রমশক্তির একটি বিশাল অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। শ্রমখাত বিশ্লেষকরা বলছেন, নিয়োগপত্রের অভাব, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা না থাকা এই শ্রমিকদের দারিদ্র্যকে স্থায়ী রূপ দিচ্ছে। ঢাকার ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোর কাছে মে দিবস মানে কেবলই আরেকটি দিন, যেখানে কাজের অভাব মানেই আগুনের বদলে উনুনে ছাই জমা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button