যশোরের চৌগাছা উপজেলার পুড়োপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাব-জোনাল অফিসকে ঘিরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার নামে অনিয়ম, গ্রাহকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় এবং একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ‘সংযোগ বাণিজ্য’ গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অফিসের ইলেকট্রিশিয়ান মো. আবুল কালাম ওরফে লাল্টু।
স্থানীয় গ্রাহকদের অভিযোগ, পুড়োপাড়া সাব-জোনাল অফিসে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে গেলে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। মাসের পর মাস, এমনকি বছর পেরিয়ে গেলেও সংযোগ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অথচ একই গ্রাহক যখন লাল্টুর মাধ্যমে যোগাযোগ করেন, তখন অল্প সময়ের মধ্যেই সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়—এমন দাবি করেছেন একাধিক গ্রাহক।
এমন অভিযোগ সত্য হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সরকারি বিদ্যুৎ সংযোগ কি অফিসের নিয়মে হয়, নাকি কোনো ব্যক্তির ‘যোগাযোগের মাধ্যমে’?
‘অফিসে আবেদন করে পাইনি, লাল্টুর কাছে গিয়ে সাত দিনে লাইন’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহকের দাবি, তিনি সরাসরি অফিসে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন ও যোগাযোগ করেও দীর্ঘদিন কোনো সমাধান পাননি। একপর্যায়ে তিনি লাল্টুর সন্ধান পান।
ওই গ্রাহকের ভাষ্য, লাল্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে বলা হয়—লাইন দেওয়া সম্ভব, তবে এজন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা লাগবে। টাকা দিলে মাত্র সাত দিনের মধ্যে সংযোগ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। পরে তিনি রাজি হন এবং তার দাবি অনুযায়ী, সাত দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়।
এই বক্তব্য সত্য হলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—একই সংযোগের জন্য অফিসের নিয়মিত প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ অপেক্ষা, কিন্তু নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করলে সাত দিনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন—এর কারণ কী?
চার সংযোগে লাখ লাখ টাকার অভিযোগ আরেক গ্রাহকের অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি জানান, বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের কাজের জন্য পাশের গ্রামের এক ইলেকট্রিশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই ইলেকট্রিশিয়ানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি চারটি সংযোগ নেন বলে দাবি করেন।
তার অভিযোগ, একটি লাইনের জন্য প্রায় ৬৫ হাজার টাকা এবং অন্য একটি লাইনে একটি খুঁটি প্রয়োজন হওয়ায় প্রায় ৮০ হাজার টাকা চুক্তি করা হয়।
তবে এসব অর্থের বিপরীতে কোনো সরকারি রসিদ দেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা অর্থগুলো সরকারি ফি নাকি ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি নিয়মে খরচ কত, বাস্তবে নেওয়া হচ্ছে কত?
গ্রাহকদের দাবি, ড্রাগন ফলের খেতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে অফিসের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াটে ৯৬০ টাকা এবং দুইটি পোল পর্যন্ত নির্ধারিত সুবিধা রয়েছে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাস্তবে কোনো কোনো গ্রাহকের কাছ থেকে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— যদি সরকারি নির্ধারিত ফি নির্দিষ্ট থাকে, তাহলে অতিরিক্ত কয়েক দশ হাজার বা লাখ টাকা কার কাছে যাচ্ছে?
এসব অর্থ যদি সরকারি ফি না হয়ে থাকে, তাহলে তার রসিদ কোথায়? আর যদি কোনো কাজের অতিরিক্ত খরচ হয়ে থাকে, তাহলে তার অনুমোদন বা সরকারি হিসাব কোথায়?
‘লাল্টুর হাত ছাড়া কাজ হয় না’—কেন?
একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, পুড়োপাড়া অফিসে লাল্টুর প্রভাব এতটাই বেশি যে তার মাধ্যমে যোগাযোগ না করলে অনেক কাজই এগোয় না। এমনকি অন্য ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে কাজ করালেও সেটি গ্রহণযোগ্য হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো—একজন ইলেকট্রিশিয়ান কীভাবে একটি সরকারি বিদ্যুৎ অফিসের সংযোগ প্রক্রিয়ায় এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠলেন?
তিনি কি শুধুই একজন কর্মচারী? নাকি তার পেছনে অফিসের ভেতরে আরও কেউ রয়েছেন?
গ্রাহকদের এমন অভিযোগের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন—লাল্টু একাই কি এসব করছেন, নাকি অফিসের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর নেপথ্য সহযোগিতা রয়েছে? ২৬টির বেশি ড্রাগন খেতে সংযোগ—তদন্তের দাবি
জানা গেছে, পুড়োপাড়া সাব-জোনাল অফিসের আওতায় ড্রাগন ফলের খেতে ২৬টির বেশি বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এসব সংযোগের আবেদন থেকে শুরু করে অনুমোদন, প্রাক্কলন, সরকারি ফি, খুঁটি ও তারের হিসাব এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষ করে প্রতিটি সংযোগের ক্ষেত্রে—- আবেদন কবে করা হয়েছে; - অনুমোদন কবে হয়েছে; - সরকারি ফি কত নেওয়া হয়েছে; - কতটি খুঁটি প্রয়োজন হয়েছে; - খুঁটি ও অন্যান্য সরঞ্জামের হিসাব কী; - গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো অর্থ নেওয়া হয়েছে কি না; - টাকা নেওয়া হলে তার রসিদ দেওয়া হয়েছে কি না; - এবং সংযোগ প্রদানের পুরো প্রক্রিয়ায় কারা দায়িত্বে ছিলেন— এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
এমন কোনো অভিযোগ পাইনি—অফিস কর্তৃপক্ষ অভিযোগের বিষয়ে পুড়োপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মো. ইমরান হোসেন বলেন, তার কাছে এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে কোনো গ্রাহক আসেননি। তিনি বলেন, অফিস কোনো কাজ বকেয়া রাখে না এবং অফিসের নীতিমালা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করে।
ইঞ্জিনিয়ার মনিরুজ্জামান মনির বলেন, তিনি এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাননি।
জুনিয়র সহকারী ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন বলেন, এ বিষয়ে তারা কিছু জানেন না।
অভিযোগের বিষয়ে লাল্টুর বক্তব্য কী?
ইলেকট্রিশিয়ান মো. আবুল কালাম ওরফে লাল্টুর সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, “আমার কিছু হবে না।”
তার এই বক্তব্যও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, তাহলে অভিযোগগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে তা পরিষ্কার করার সুযোগ ছিল। আবার অভিযোগগুলো সত্য না হলে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে অফিসিয়াল নথি দেখিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করাও সম্ভব।
তাহলে ‘মূল হোতা’ কে?
পুড়োপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ এখন শুধু একজন ইলেকট্রিশিয়ানকে ঘিরে নয়; বরং এর সঙ্গে অফিসের আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
কারণ, একজন মাঠপর্যায়ের কর্মচারী যদি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রাহকের সংযোগ দিতে বা আটকে রাখতে পারেন—তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, তার হাতে সেই ক্ষমতা এলো কোথা থেকে?
আর যদি তিনি একা এসব করার সুযোগ না পান, তাহলে তার পেছনে কারা রয়েছেন?
স্থানীয় গ্রাহকদের দাবি, তদন্ত হলে অভিযোগের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। এজন্য পুড়োপাড়া সাব-জোনাল অফিসের গত কয়েক বছরের বিদ্যুৎ সংযোগের আবেদন, অনুমোদন, সরকারি ফি, খুঁটি-তার সরবরাহ, ঠিকাদারি কাজ এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের হিসাব নিরীক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে লাল্টুসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এখন প্রশ্ন একটাই— পুড়োপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে আসলে নিয়মের রাজত্ব চলছে, নাকি ‘লাল্টু’ নামের একটি ব্যক্তিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে সংযোগের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা?
অভিযোগের সত্যতা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সময়ের দাবি।