জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে রাজধানীতে আবারও শুরু হয়েছে গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সরকার নির্দিষ্ট হারে ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া সমন্বয় করলেও সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইচ্ছেমতো বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সিএনজিচালিত বাসগুলোও। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে গ্যাসের দাম অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও সিএনজিচালিত বাসে আদায় করা হচ্ছে ডিজেলের বর্ধিত ভাড়া।

সম্প্রতি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকার ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, এই বর্ধিত ভাড়ার সিদ্ধান্ত শুধু ডিজেলচালিত যানবাহনের জন্যই প্রযোজ্য। সিএনজিচালিত বাসের ক্ষেত্রে ভাড়া বাড়ানোর কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

বাস্তবচিত্র কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানীর রামপুরা, নতুনবাজার, উত্তরা, পোস্তগোলা ও শাহবাগসহ বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী গণপরিবহনগুলোতে দেখা গেছে চরম অনিয়ম। রাইদা এন্টারপ্রাইজ, ভিক্টর ক্লাসিক, অনাবিল ও ভিআইপি পরিবহনের মতো একাধিক বাস কোম্পানিতে নির্দিষ্ট দূরত্বের ভাড়ার চেয়ে এক লাফে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাসের ড্যাশবোর্ডে সিএনজি মিটার সচল থাকা সত্ত্বেও কন্ডাক্টররা যাত্রীদের কাছ থেকে ডিজেলের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বেশি টাকা দাবি করছেন। প্রতিবাদ করলে ভাংতি টাকার অজুহাত কিংবা নানা অসংলগ্ন যুক্তিতে যাত্রীদের নিরুপায় করা হচ্ছে।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম জানান, সিএনজিচালিত বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং সমিতি থেকেও এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও বাসের যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান ভাড়ার কাঠামোতে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গণপরিবহনে মানসম্মত সেবা বজায় রাখতে ভাড়া পুনর্মূল্যায়ন অথবা সরকারকে সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকি দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এ বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত হারের চেয়ে এক পয়সাও বেশি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের বিরুদ্ধে জরিমানা ও ক্ষেত্রবিশেষে রুট পারমিট বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এই নৈরাজ্য বন্ধ করা কঠিন। বুয়েটের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের মতে, রাজধানীজুড়ে বিশৃঙ্খলা বন্ধের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো ‘বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি’ এবং ডিজিটাল ‘ই-টিকিটিং’ ব্যবস্থা চালু করা। বাসগুলোকে নির্দিষ্ট একটি ব্যবস্থার অধীনে এনে ডিজিটাল টিকিটিং চালু করা গেলে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে।